ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি অব চায়না (USTC)-এর গবেষকরা এমন একটি নতুন কনট্যাক্ট লেন্স তৈরি করেছেন, যা মানুষের চোখকে দৃশ্যমান আলোর বাইরের ইনফ্রারেড আলো শনাক্ত করতে সাহায্য করে। ফলে অন্ধকারে, এমনকি চোখ বন্ধ থাকলেও, ইনফ্রারেড আলোর ঝলক দেখা সম্ভব হতে পারে।
গবেষক ইউকিয়ান মা এবং তাঁর দল সাধারণ নরম কনট্যাক্ট লেন্সের সঙ্গে ৪৫ ন্যানোমিটার আকারের বিশেষ ন্যানোপার্টিকেল যুক্ত করেছেন। এসব কণায় সোনা (Gold), সোডিয়াম গ্যাডোলিনিয়াম ফ্লোরাইড, ইটার্বিয়াম এবং আর্বিয়াম আয়ন রয়েছে।
বিজ্ঞান সাময়িকী Cell-এ প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, এই আপকনভার্সন কনট্যাক্ট লেন্স (UCL) ৮০০ থেকে ১,৬০০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ইনফ্রারেড আলোকে মানুষের চোখে দেখা যায় এমন আলোতে রূপান্তর করতে পারে।
ন্যানোপার্টিকেলগুলো ইনফ্রারেড আলোর শক্তি বাড়িয়ে সেটিকে লাল, সবুজ ও নীল – এই তিনটি মৌলিক দৃশ্যমান রঙে রূপান্তর করে। এর ফলে মানুষ সেই আলো দেখতে পারে।
তবে বর্তমানে এই প্রযুক্তির একটি বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ন্যানোপার্টিকেলের কারণে আলো ছড়িয়ে পড়ে, ফলে লেন্সে দেখা ছবি বেশ ঝাপসা হয়। তাই প্রচলিত নাইট ভিশন গগলস, যা দুর্বল ইনফ্রারেড আলোকে অনেক বেশি স্পষ্ট করে দেখায়, এখনো এই লেন্সের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর।
গবেষণার শুরুতে বিজ্ঞানীরা ইঁদুরের রেটিনায় ন্যানোপার্টিকেল প্রবেশ করিয়ে দেখেন যে তারা অন্ধকারে দেখতে সক্ষম হয়। পরে একই প্রযুক্তি কনট্যাক্ট লেন্সে ব্যবহার করা হয়, ফলে রেটিনায় ইনজেকশন দেওয়ার প্রয়োজন হয় না এবং এটি ব্যবহার করা অনেক সহজ হয়।
এই মুহূর্তের ট্রেন্ডিং আর্টিকেলগুলো
পরীক্ষায় দেখা গেছে, মানুষ অন্ধকারে এই লেন্স পরে ইনফ্রারেড আলোর সাহায্যে অক্ষর, বিভিন্ন নকশা এবং ঝলকানো সংকেত শনাক্ত করতে পেরেছেন। আরও মজার বিষয় হলো, চোখ বন্ধ থাকলেও এই লেন্স ভালো কাজ করে। কারণ ইনফ্রারেড আলো চোখের পাতার ভেতর দিয়ে প্রবেশ করতে পারে, কিন্তু সাধারণ দৃশ্যমান আলো তা পারে না।
প্রকৃতিতে অনেক প্রাণী অন্ধকারে শিকার করার জন্য ইনফ্রারেড বিকিরণ শনাক্ত করতে পারে। তারা এটিকে মানুষের মতো আলো হিসেবে দেখে না, বরং বস্তু থেকে নির্গত তাপ অনুভব করে। এই ক্ষমতা কিছু সাপ (যেমন পিট ভাইপার ও র্যাটলস্নেক), কিছু মাছ, ব্যাঙ এবং রক্তচোষা পোকামাকড়ের মধ্যে দেখা যায়।
অন্যদিকে মানুষ, অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং পাখি ইনফ্রারেড আলো দেখতে পারে না। কারণ তাদের চোখে এ ধরনের আলো শনাক্ত করার উপযুক্ত রিসেপ্টর নেই। এছাড়া শরীরের নিজের তাপও ইনফ্রারেড শনাক্তে বাধা সৃষ্টি করে।
গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এই লেন্স ক্রিপ্টোগ্রাফি, গোপন তথ্য শনাক্ত করা, অস্ত্রোপচার, নকল পণ্য বা নথি শনাক্ত করা এবং কম দৃশ্যমান পরিবেশে উদ্ধারকাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে, অনেক নথিতে থাকা অদৃশ্য নিরাপত্তা চিহ্ন ইনফ্রারেড আলোতে দেখা যায়, যা এই লেন্সের মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
তবে কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, এসব কাজে বর্তমানে ব্যবহৃত নাইট ভিশন প্রযুক্তি এখনও অনেক বেশি শক্তিশালী এবং ব্যবহারেও সহজ। তাই এই লেন্সের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হওয়ার আগে আরও উন্নয়ন প্রয়োজন।








