যুক্তরাষ্ট্রের পেন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলীরা শিল্পকলা ও বিজ্ঞানকে একত্র করে এমন এক ধরনের সুন্দর, রঙিন অস্থায়ী স্মার্ট ট্যাটু তৈরি করছেন, যা ত্বকে আঁকা যায়। এই ট্যাটু ভবিষ্যতে হার্ট অ্যাটাকের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করতে, রোবোটিক কৃত্রিম অঙ্গ (প্রস্থেটিক) নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে এবং মস্তিষ্কের তরঙ্গ (ব্রেইন ওয়েভ) পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। প্রয়োজন হলে এটি সহজেই ধুয়ে ফেলা বা আবার নতুন করে আঁকা যাবে।
গবেষকরা এমন একটি বিদ্যুৎ পরিবাহী (কন্ডাকটিভ) কালি তৈরি করেছেন, যার জন্য তারা অস্থায়ী পেটেন্টের আবেদনও করেছেন। এই কালি দিয়ে ত্বকের ওপর ইচ্ছামতো নকশায় ট্যাটু আঁকা যায় এবং সেটিই বিভিন্ন স্বাস্থ্য-পর্যবেক্ষণ সেন্সরকে কার্যকর করে। কালি যেকোনো রঙে তৈরি করা সম্ভব। এতে এমন উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে, যা ত্বকের সঙ্গে আরও ভালোভাবে লেগে থাকে। ফলে এটি শুধু আকর্ষণীয় দেখায় না, বরং প্রচলিত পরিধানযোগ্য (Wearable) সেন্সরের তুলনায় বেশি সংবেদনশীল, টেকসই এবং নির্ভুল।
গবেষণার ফলাফল ১৩ জুলাই Proceedings of the National Academy of Sciences (PNAS) জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক এবং পেন স্টেটের ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্স অ্যান্ড মেকানিক্স বিভাগের অধ্যাপক ল্যারি চেং জানান, বর্তমানে পরিধানযোগ্য স্বাস্থ্য-প্রযুক্তির বেশিরভাগ ডিভাইস শরীরে লাগানো ইলেকট্রোড ব্যবহার করে কাজ করে। এই ইলেকট্রোডগুলো শরীর থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সংকেত সংগ্রহ করে হৃদযন্ত্র, পেশি ও মস্তিষ্কের কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে –
- EEG (Electroencephalogram) সংকেতের মাধ্যমে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করা যায়।
- ECG (Electrocardiogram) সংকেত ব্যবহার করে হৃদস্পন্দন মাপা যায় এবং হৃদযন্ত্রের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ বিশদভাবে বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য সমস্যা শনাক্ত করা যায়।
- EMG (Electromyogram) সংকেতের মাধ্যমে পেশির সংকোচন ও কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।
এই মুহূর্তের ট্রেন্ডিং আর্টিকেলগুলো
বর্তমানে ব্যবহৃত অধিকাংশ ইলেকট্রোড শক্ত ধাতব উপাদান দিয়ে তৈরি। এগুলো স্থিতিশীল হলেও হাঁটা, দৌড়ানো বা ব্যায়ামের সময় শরীরের সঙ্গে ঠিকভাবে লেগে থাকতে পারে না। এ সমস্যা সমাধানে গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরে হাইড্রোজেল নামের একটি নরম, জেলির মতো উপাদান নিয়ে কাজ করছেন। এটি পানি শোষণ করে প্রসারিত হতে পারে, ফলে শরীরের নড়াচড়ার সঙ্গে সহজে মানিয়ে নিতে পারে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হাইড্রোজেল শুকিয়ে যায়, যার ফলে ইলেকট্রোডের আঠালো ক্ষমতা ও নমনীয়তা কমে যায় এবং দীর্ঘ সময় ব্যবহারে এর কার্যকারিতা হ্রাস পায়।
গবেষণাপত্রের প্রথম লেখক এবং পেন স্টেটের পিএইচডি গবেষক ওয়ানচিং ঝাং বলেন, সেন্সরের নির্ভুলতা কমে যাওয়ার কারণ শুধু ইলেকট্রোড খুলে যাওয়া নয়, বরং সেগুলো শরীরে লাগানোর পদ্ধতিও একটি বড় সমস্যা। বর্তমানে বাজারে থাকা অনেক বাণিজ্যিক সেন্সর লোমযুক্ত বা ঘামে ভেজা ত্বকে সঠিকভাবে বসানো কঠিন হওয়ায় শরীরের প্রকৃত বৈদ্যুতিক সংকেত নির্ভুলভাবে সংগ্রহ করতে পারে না। ফলে স্বাস্থ্য-তথ্য সংগ্রহে ভুল বা কম নির্ভুল ফল পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
ওয়ানচিং ঝাং বলেন,
বর্তমানে ব্যবহৃত বেশিরভাগ বাণিজ্যিক ইলেকট্রোড আগে থেকেই ল্যাব বা কারখানায় তৈরি করা হয় এবং পরে ত্বকের ওপর লাগানো হয়। ফলে ত্বক ও ইলেকট্রোডের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম বাতাসের স্তর থেকে যায়, যা সেন্সরের নির্ভুলতা কমিয়ে দেয়। এই সমস্যা দূর করতে আমরা এমন একটি বিদ্যুৎ পরিবাহী কালি তৈরি করেছি, যা সরাসরি ত্বকের ওপর আঁকা যায়। কালি শুকিয়ে গেলে সেটিই কার্যকর ইলেকট্রোড হিসেবে কাজ করে।
বিরক্তিকর প্যাচ নয়, এবার তুলি দিয়ে আঁকুন নিজের স্মার্ট ট্যাটু
এই বিশেষ কালি তৈরির জন্য গবেষকরা পানিভিত্তিক একটি দ্রবণে বিভিন্ন ধরনের পলিমার (প্লাস্টিকজাত উপাদান) এবং কিছু অম্লীয় (অ্যাসিডিক) উপাদান মিশিয়েছেন। ঝাং জানান, ভেজা অবস্থায় কালিটির ঘনত্ব অনেকটা আঠার মতো থাকে, তবে এটি ১০ মিনিটেরও কম সময়ে ত্বকের ওপর শুকিয়ে যায়। চাইলে হেয়ার ড্রায়ার ব্যবহার করে আরও দ্রুত শুকানো যায়।

গবেষণার প্রধান লেখক অধ্যাপক ল্যারি চেং বলেন,
“এই কালি অনেকটা ফেস পেইন্টের মতো ব্যবহার করা যায়। শুরুতে এটি প্রায় স্বচ্ছ থাকে, তবে খাদ্য-নিরাপদ রং (ফুড ডাই) মিশিয়ে এটিকে যেকোনো রঙে তৈরি করা সম্ভব। এরপর যে কেউ নিজের পছন্দমতো নকশা – যেমন কোনো কার্টুন চরিত্র বা সুপারম্যানের ছবি – এঁকে নিতে পারেন। এতে পরিধানযোগ্য এই সেন্সরকে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী সাজানো সম্ভব।”
গবেষকরা ইতোমধ্যেই এই কালি দিয়ে বিভিন্ন রঙ ও নকশার সেন্সর তৈরি করেছেন। এর মধ্যে শিয়ালের ছবি, হাসিখুশি কার্টুন চরিত্রসহ নানা আকর্ষণীয় ডিজাইন রয়েছে। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের সেন্সর শুধু কার্যকরই হবে না, দেখতে হবে রঙিন, মজার এবং সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী সাজানো।
ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী ব্যবহারযোগ্য, আরও নির্ভুল ও আরামদায়ক স্মার্ট ট্যাটু
গবেষকরা জানিয়েছেন, এই স্মার্ট ট্যাটু শুধু ইচ্ছামতো নকশায় আঁকা যায় না, বরং এর সেন্সরগুলো খুবই সংবেদনশীল ও নির্ভুলভাবে কাজ করে। গবেষক ওয়ানচিং ঝাং বলেন, কালি সরাসরি ত্বকের ওপর আঁকা হওয়ায় এটি ত্বকের সূক্ষ্ম গঠন বা টেক্সচারের সঙ্গে ভালোভাবে মিশে যায়। ফলে শরীরের বৈদ্যুতিক সংকেত আরও নির্ভুলভাবে মাপা সম্ভব হয়।
সেন্সর ও ইলেকট্রোডের সংযোগ আরও মজবুত করতে গবেষকরা একটি ছিদ্রযুক্ত রূপার কাপড় (silver textile) ব্যবহার করেছেন, যা দেখতে অনেকটা ধাতব কাপড়ের মতো। ভেজা কালি প্রথমে এই কাপড়ের ভেতরে প্রবেশ করে, তারপর শুকিয়ে ত্বকের সঙ্গে শক্তভাবে লেগে যায়। এরপর কাপড়টির সংযোগ অংশ একটি ছোট ইলেকট্রনিক মডিউলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এই মডিউলটি কাপড়ের নিচে ত্বকে লাগানো থাকে এবং ব্লুটুথের মাধ্যমে সংগ্রহ করা তথ্য তারবিহীনভাবে কম্পিউটারে পাঠিয়ে দেয়।
এই বিশেষ ধাতব কাপড়টি নিজের মূল আকারের ১৫০ শতাংশেরও বেশি পর্যন্ত প্রসারিত হতে পারে, তবুও এটি ছিঁড়ে যায় না। পাশাপাশি এটি ত্বকের সঙ্গে সমানভাবে লেগে থাকে এবং বৈদ্যুতিক সংকেত নির্ভুলভাবে সংগ্রহ করতে সাহায্য করে।
অধ্যাপক ল্যারি চেং বলেন,
প্রচলিত ইলেকট্রোড দীর্ঘ সময় ব্যবহার করলে ঘাম ও আর্দ্রতা জমে যায়। এতে ত্বকে অস্বস্তি বা জ্বালাপোড়া হতে পারে, এমনকি ইলেকট্রোড ত্বক থেকে আলগাও হয়ে যেতে পারে। কিন্তু আমাদের ব্যবহৃত ছিদ্রযুক্ত উপাদান ঘাম ও এমনকি লোমের মধ্য দিয়েও সহজে কাজ করতে পারে। ফলে ইলেকট্রোড আরও আরামদায়ক, ভালোভাবে লেগে থাকে এবং বৈদ্যুতিক সংকেতও ভালোভাবে পরিবহন করতে পারে।
দৈনন্দিন কাজ, ব্যায়াম এবং রোবোটিক হাত নিয়ন্ত্রণেও সফল
একটি পরীক্ষায় গবেষকরা দেখিয়েছেন, এই আঁকা ইলেকট্রোড একজন গবেষকের ১২ ঘণ্টার দৈনন্দিন কাজের সময় সফলভাবে ইসিজি (ECG) তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছে। আরেকটি পরীক্ষায় একজন অংশগ্রহণকারী ব্যায়াম করার সময়ও এটি একইভাবে নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ করেছে। এতে প্রমাণ হয়েছে, শারীরিক নড়াচড়ার সময়ও ইলেকট্রোড ত্বকে শক্তভাবে লেগে থাকে এবং নির্ভুলভাবে কাজ করে।
আরও একটি পরীক্ষায় গবেষকরা একজন অংশগ্রহণকারীর হাতের পেশির (EMG) বৈদ্যুতিক সংকেত সংগ্রহ করে একটি রোবোটিক কৃত্রিম হাত (প্রস্থেটিক) নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হন। অর্থাৎ, ব্যক্তি কোনো স্পর্শ ছাড়াই শুধু নিজের পেশির সংকেত ব্যবহার করে রোবোটিক হাতটি নাড়াতে পেরেছেন।
সহজে ধুয়ে ফেলা যাবে, আবার নতুন করে আঁকাও যাবে
অধ্যাপক চেং বলেন, “আমরা ১২ ঘণ্টা ব্যবহার করে পরীক্ষা চালালেও এটিই এর সর্বোচ্চ সীমা নয়। প্রয়োজনে ইলেকট্রোড সহজেই ধুয়ে ফেলা যাবে এবং আবার নতুন করে আঁকা যাবে। ভবিষ্যতে এমন হতে পারে যে মূল ইলেকট্রনিক সেন্সর মডিউলটি একবার কিনলেই চলবে, আর ত্বকে আঁকা ইলেকট্রোডগুলো হবে সস্তা ও একবার ব্যবহারযোগ্য। একটি কালি ভর্তি বোতল দিয়েই কয়েক দিন বা এক সপ্তাহ ধরে বহুবার নতুন ইলেকট্রোড আঁকা সম্ভব হবে।”
ভবিষ্যতে গ্লুকোজ ও কর্টিসলও মাপতে পারবে
গবেষকরা এখন এই প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করার কাজ করছেন, যাতে এটি ভবিষ্যতে কর্টিসল (স্ট্রেস হরমোন), গ্লুকোজ (রক্তে শর্করা) সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বায়োমার্কার শনাক্ত করতে পারে।
অধ্যাপক চেং জানান, এই প্রযুক্তি শুধু চিকিৎসা ক্ষেত্রেই নয়, উদ্ভিদবিজ্ঞানেও ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। গবেষকরা এমন “স্মার্ট উদ্ভিদ” তৈরি করতে চান, যা পরিবেশে থাকা বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ শনাক্ত করে বিজ্ঞানীদের জানাতে পারবে এবং সেগুলো উদ্ভিদের স্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব ফেলছে, সে সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য দেবে।








