শিশুদের মুখের রুচি বাড়াতে প্রতিদিন বৈচিত্র্যময়, পুষ্টিকর ও রঙিন খাবার পরিবেশন করুন, জোর না করে ধীরে ধীরে নতুন খাবারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিন।
হাতে ভাতের বাটি নিয়ে বাচ্চার পেছনে পেছনে দৌড়ানো – এটি বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটা মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের মায়েদের অত্যন্ত সাধারণ এবং প্রতিদিনের চেনা দৃশ্য। ১ থেকে ৩ বছর বয়সী বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এই খাওয়ার অরুচি বা খুঁতখুঁতে খাবার অভ্যাস (Picky Eating) মায়েদের জন্য এক চরম মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আসলে এই বয়সে শিশুদের বৃদ্ধির গতি প্রথম বছরের তুলনায় কিছুটা ধীর হয়ে আসে, যার ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাদের ক্ষুধা কিছুটা কমে যায়। এর ওপর যদি প্রতিদিন একই স্বাদের ও একই রঙের খাবার (যেমন- রোজ রোজ ব্লেন্ড করা আলু-চাল-ডালের পাতলা খিচুড়ি) দেওয়া হয়, তবে শিশু খাবারের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। শিশুদের প্রয়োজন এমন খাবার যা দেখতে আকর্ষণীয়, স্বাদে বৈচিত্র্যময় এবং অল্প মুখে দিলেই যেন পর্যাপ্ত পুষ্টি পাওয়া যায়।
আজকের গাইডে আমরা জানবো কীভাবে সাধারণ কিছু ঘরের খাবারকে মজাদার ও পুষ্টিকর রেসিপিতে রূপান্তর করে শিশুর মুখের রুচি ফিরিয়ে আনা যায়।
শিশুর অরুচি দূর করার পুষ্টিবিজ্ঞান: কিছু জাদুকরী ট্রিকস
রেসিপিতে যাওয়ার আগে আমাদের বুঝতে হবে বাচ্চাদের সাইকোলজি বা মনস্তত্ত্ব। খাবারকে শিশুর কাছে আকর্ষণীয় করার কিছু মূল চাবিকাঠি নিচে দেওয়া হলো:
- রঙের খেলা: বাচ্চারা চোখ দিয়ে প্রথমে খাবার খায়। তাদের প্লেটে লাল গাজর, সবুজ ব্রোকলি বা পালংশাক, হলুদ মিষ্টি কুমড়া—এভাবে নানা রঙের খাবার সাজিয়ে দিন।
- আকর্ষণীয় টেক্সচার ও শেপ: গোল গোল প্যানকেক, তারার আকৃতির পরোটা বা ছোট ছোট নাগেটস বা বলের মতো খাবার বাচ্চারা নিজের হাতে ধরে (Finger Foods) খেতে পছন্দ করে।
- অতিরিক্ত ব্লেন্ড করার অভ্যাস ত্যাগ: ১ বছরের পর শিশুকে অতিরিক্ত ব্লেন্ড করা বা একদম তরল খাবার খাওয়ালে চিবানোর অভ্যাস তৈরি হয় না, যা পরবর্তীতে অরুচির মূল কারণ হয়। খাবার একটু দানাদার বা ম্যাশ করা হওয়া উচিত।
- খাবারে ন্যাচারাল ফ্লেভার: খাবারে কৃত্রিম টেস্টিং সল্ট বা অতিরিক্ত চিনি না দিয়ে এলাচ গুঁড়ো, দারুচিনি, সামান্য জিরা গুঁড়ো বা ঘি ব্যবহার করুন। সুবাস শিশুদের ক্ষুধা উদ্দীপিত করে।
এই মুহূর্তের ট্রেন্ডিং আর্টিকেলগুলো
শিশুদের মুখের রুচি বাড়ানোর ৪টি পুষ্টিকর রেসিপি
বাঙালি মায়েদের পরিচিত কিছু চেনা খাবারকেই একটু টুইস্ট দিয়ে কীভাবে শিশুর জন্য অমৃত বানিয়ে তোলা যায়, চলুন দেখে নেওয়া যাক:
১। ঘরে তৈরি শাহী সেরেলাক

বাজারের কেনা সেরেলাকে প্রিজারভেটিভ এবং অতিরিক্ত চিনি থাকার ঝুঁকি থাকে। অথচ ঘরেই আপনি এর চেয়ে ১০ গুণ বেশি পুষ্টিকর সেরেলাক বানিয়ে ৩-৪ মাস সংরক্ষণ করতে পারেন।
উপকরণ
পোলাও চাল বা লাল চাল ১ কাপ, সাগু দানা আধা কাপ, ওটস ১ কাপ, ডাল (মুগ, মসুর ও ছোলার ডাল মিলিয়ে) ১ কাপ, কাঠবাদাম ও কাজুবাদাম ১০-১২টি, সামান্য এলাচ গুঁড়ো।
প্রস্তুত প্রণালী
১. চাল ও ডাল ভালো করে ধুয়ে কড়া রোদে শুকিয়ে নিন।
২. এবার শুকনো কড়াইতে চাল, ডাল, ওটস, সাগু দানা এবং বাদাম আলাদা আলাদা করে হালকা আঁচে ড্রাই রোস্ট (তেল ছাড়া ভাজা) করে নিন। খেয়াল রাখবেন যেন পুড়ে না যায়।
৩. সব উপাদান ঠান্ডা করে ব্লেন্ডারে ভালো করে গুড়ো বা পাউডার করে নিন। এরপর চালনি দিয়ে চেলে একটি এয়ারটাইট কাঁচের বয়ামে রেখে দিন।
কীভাবে খাওয়াবেন
শিশুর যখনই হালকা ক্ষুধা লাগবে, ১ কাপ ফুটন্ত পানিতে বা দুধে ২ টেবিল চামচ এই পাউডার এবং সামান্য তালমিছরি বা খেজুরের পিউরি দিয়ে জ্বাল দিয়ে সুজির মতো ঘন করে খাইয়ে দিন। উপর থেকে ১ চামচ ঘি ছড়িয়ে দিলে এর স্বাদ ও পুষ্টি বহুগুণ বেড়ে যাবে।
২। ডিম, সবজি, সুজির পুডিং

মিষ্টি সুজি খেতে খেতে অনেক বাচ্চারাই ক্লান্ত হয়ে যায়। তাদের জন্য এই নোনতা ও প্রোটিন সমৃদ্ধ সুজির পুডিং দারুণ এক চেঞ্জ।
উপকরণ
সুজি ৩ টেবিল চামচ, ডিম ১টি, মিহি কুচি করা সবজি (গাজর, পেঁপে বা বরবটি) ২ চামচ, পেঁয়াজ কুচি সামান্য, ঘি ১ চামচ, এক চিমটি গোলমরিচ গুঁড়ো ও লবণ (১ বছরের ঊর্ধ্বে শিশুদের জন্য)।
প্রস্তুত প্রণালী
১. কড়াইতে ঘি গরম করে সুজি ও পেঁয়াজ কুচি হালকা ভেজে নিন।
২. এবার এতে সবজি কুচি ও সামান্য পানি দিয়ে সবজি নরম হওয়া পর্যন্ত সেদ্ধ করুন।
৩. সবজি সেদ্ধ হয়ে সুজি মাখামাখা হলে একটি বাটিতে ডিমটি ভালো করে ফেটিয়ে সুজির মধ্যে ঢেলে দিন এবং অনবরত নাড়তে থাকুন যেন ডিমটি সুজির সাথে স্ক্র্যাম্বলড হয়ে মিশে যায়।
৪. নামানোর আগে গোলমরিচ গুঁড়ো এবং সামান্য ঘি ছড়িয়ে নামিয়ে নিন। এটি দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনই ডিমের প্রোটিন ও সবজির ভিটামিনে ভরপুর।
৩। ওটস ও ডিমের প্যানকেক

সকালের নাস্তা বা বিকালের স্ন্যাক্সে এই প্যানকেকটি বাচ্চাদের আঙুল চেটেপুটে খেতে বাধ্য করবে।
উপকরণ
ওটস পাউডার আধা কাপ, পাকা কলা ১টি, ডিম ১টি, তরল দুধ ৩-৪ চামচ, ঘি বা মাখন ১ চামচ।
প্রস্তুত প্রণালী
১. একটি বাটিতে পাকা কলাটি কাঁটাচামচ দিয়ে খুব ভালো করে ম্যাশ বা চটকে নিন।
২. এর মধ্যে ওটস পাউডার, ডিম এবং তরল দুধ দিয়ে একটি মসৃণ ও ঘন ব্যাটার বা গোলা তৈরি করুন।
৩. নন-স্টিক প্যানে সামান্য মাখন বা ঘি ব্রাশ করে ছোট ছোট গোল আকারে ব্যাটার ঢেলে দিন।
৪. চুলার আঁচ কমিয়ে ঢাকনা দিয়ে দু’পাশ সোনালী করে ভেজে তুলুন। কলার মিষ্টি স্বাদের কারণে এতে বাড়তি চিনির কোনো প্রয়োজনই নেই।
৪। পূষ্টিতে ভরপুর স্পেশাল বাটার-চিকেন খিচুড়ি

রোজকার চেনা জ্যালাজ্যালে খিচুড়ি বাদ দিয়ে সপ্তাহে ২-৩ দিন এই স্পেশাল ও ক্যালরি-ঘন খিচুড়িটি ট্রাই করুন।
উপকরণ
নাজিরশাইল বা বাসমতি চাল আধা কাপ, মুগ ডাল ৩ চামচ, মুরগির মাংসের কিমা ১/৪ কাপ, কিউব করা সবজি (মিষ্টি আলু, ব্রোকলি, গাজর) আধা কাপ, পেঁয়াজ-রসুন বাটা আধা চা চামচ, মাখন বা বাটার ১ চামচ, সামান্য হলুদ ও জিরার গুঁড়ো।
প্রস্তুত প্রণালী
১. প্যানে মাখন গরম করে পেঁয়াজ-রসুন বাটা দিয়ে মাংসের কিমাটি হালকা ভেজে নিন।
২. এরপর চাল, ডাল ও সবজিগুলো দিয়ে মসলাসহ মৃদু আঁচে কষিয়ে নিন।
৩. পর্যাপ্ত পানি দিয়ে প্রেসার কুকারে ৩টি সিটি দিন যেন সব একদম নরম হয়ে যায়।
৪. নামানোর পর চামচ দিয়ে সামান্য ম্যাশ করে নিন, তবে একদম তরল করবেন না। মাখনের ফ্লেভার ও মাংসের স্বাদে এটি বাচ্চারা খুব আগ্রহ নিয়ে খাবে।
পুষ্টির তুলনামূলক ছক: কোন খাবারে কী মিলবে?
| রেসিপির নাম | প্রধান পুষ্টি উপাদান | ক্যালরির মাত্রা | কেন রুচি বাড়াতে সেরা? |
| হোমমেড সেরেলাক | জটিল শর্করা, উদ্ভিজ্জ প্রোটিন, গুড ফ্যাট (বাদাম থেকে) | উচ্চ ক্যালরি সমৃদ্ধ | বাদাম ও এলাচের শাহী সুবাসে বাচ্চার ক্ষুধা বাড়ে। |
| সুজি-ডিম পুডিং | ফার্স্ট ক্লাস প্রোটিন, ফাইবার, ভিটামিন এ | মাঝারি থেকে উচ্চ | নরম ও চিউই টেক্সচারের কারণে বাচ্চারা সহজে গিলতে পারে। |
| ওটস-কলা প্যানকেক | পটাশিয়াম, দ্রবণীয় ফাইবার, আয়রন। | মাঝারি | মিষ্টি স্বাদ ও ফিঙ্গার ফুড হিসেবে নিজের হাতে খাওয়া শেখায়। |
| বাটার-চিকেন খিচুড়ি | প্রাণিজ প্রোটিন, জিঙ্ক, ভিটামিন এ ও সুস্থ ফ্যাট। | উচ্চ ক্যালরি | মাখনের চমৎকার অ্যারোমা এবং মাংসের উমামি স্বাদ রুচি বাড়ায়। |
মায়েদের জন্য কিছু জরুরি পরামর্শ

১. জোর করে খাওয়ানো বন্ধ করুন
শিশু খেতে না চাইলে জোর করে বা মারধর করে খাওয়ালে খাবারের প্রতি তার স্থায়ী ভীতি তৈরি হয়। ক্ষিধে লাগলে সে নিজেই খাবে – এই নীতিতে বিশ্বাস রাখুন।
২. স্ন্যাক্সের সময় নিয়ন্ত্রণ
প্রধান খাবারের ঠিক ১-২ ঘণ্টা আগে বাচ্চাকে দুধ, জুস, বিস্কুট বা চিপস দেবেন না। এতে পেট ভরা থাকে বলে সে ভাতের সময় খেতে চায় না।
৩. খাওয়ার সময় টিভি/মোবাইল বন্ধ
মোবাইল বা টিভি দেখিয়ে খাওয়ালে শিশু খাবারের স্বাদ, গন্ধ ও টেক্সচার বুঝতে পারে না। ফলে তার ব্রেন সিগন্যাল পায় না যে সে কী খাচ্ছে। তাই পরিবারের সবার সাথে টেবিলে বসিয়ে তাকে নিজে হাতে খাওয়ার অভ্যাস করান।
শেষ কথা
প্রতিটি শিশুই অনন্য। একজনের যা ভালো লাগে, অন্যজনের তা নাও লাগতে পারে। তাই হাল না ছেড়ে খাবারের রেসিপিতে বৈচিত্র্য আনুন। পুষ্টিকর উপাদানগুলোকে একটু নতুন রূপ দিয়ে পরিবেশন করলেই দেখবেন ঘরের খাবারের প্রতি আপনার ছোট্ট সোনামণির অনীহা কেটে গেছে এবং তার সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত হচ্ছে।








