Home অসুখ-বিসুখ বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ বিস্তার: কেন আক্রান্ত হচ্ছেন প্রাপ্তবয়স্করাও?

বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ বিস্তার: কেন আক্রান্ত হচ্ছেন প্রাপ্তবয়স্করাও?

44
0
প্রাপ্তবয়স্করাও হামে আক্রান্ত

বাংলাদেশে উদ্বেগজনকভাবে প্রাপ্তবয়স্করাও হামে আক্রান্ত হচ্ছেন, কারণ অনেকেই ছোটবেলায় পূর্ণ টিকা নেননি এবং বর্তমানে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে।

 

বাংলাদেশে আবারও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে হাম রোগের সংক্রমণ। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও শিশু আক্রান্ত হচ্ছে, এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো – এখন শুধু শিশুরাই নয়, প্রাপ্তবয়স্করাও হামে আক্রান্ত হচ্ছেন। সম্প্রতি একজন প্রাপ্তবয়স্কের মৃত্যুর খবর পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।

অনেকেই মনে করেন হাম শুধুই শিশুদের রোগ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ভাইরাসটি বয়স দেখে আক্রমণ করে না। যার শরীরে পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নেই, সে-ই ঝুঁকিতে পড়ে। ফলে প্রশ্ন উঠছে – কেন বড়রা আক্রান্ত হচ্ছেন? আর এই বিপজ্জনক রোগ থেকে বাঁচার উপায় কী?

হাম আসলে কী?

হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এটি মূলত বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি বা হাঁচি দিলে ভাইরাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং অন্যরা খুব সহজেই আক্রান্ত হতে পারেন।

হামের ভাইরাস এতটাই শক্তিশালী যে আক্রান্ত ব্যক্তির কাছাকাছি থাকলে ১০ জনের মধ্যে প্রায় ৯ জন আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন, যদি তাদের টিকা না নেওয়া থাকে বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়।

হামের লক্ষণগুলো কী?

হামের প্রাথমিক লক্ষণ অনেকটা সাধারণ সর্দি-জ্বরের মতো। এজন্য প্রথমদিকে অনেকেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো:

  • উচ্চ জ্বর
  • কাশি
  • নাক দিয়ে পানি পড়া
  • চোখ লাল হয়ে যাওয়া
  • দুর্বলতা
  • শরীরে লালচে ফুসকুড়ি

সাধারণত জ্বর শুরু হওয়ার কয়েকদিন পর মুখ থেকে শুরু করে সারা শরীরে ফুসকুড়ি ছড়িয়ে পড়ে।

কেন প্রাপ্তবয়স্করা এখন হামে আক্রান্ত হচ্ছেন?

এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।

১. ছোটবেলায় টিকা না নেওয়া

বাংলাদেশে অনেক বছর ধরে টিকাদান কর্মসূচি চালু থাকলেও আগে সবার কাছে টিকা পৌঁছাত না। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল বা দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া অনেক মানুষ ছোটবেলায় হাম টিকা পাননি। ফলে এখন বড় বয়সে এসে তারা ঝুঁকিতে পড়ছেন।

২. এক ডোজ টিকা নেওয়া

অনেকের ক্ষেত্রে ছোটবেলায় হয়তো একবার টিকা নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু দ্বিতীয় ডোজ নেওয়া হয়নি। অথচ হাম প্রতিরোধে পূর্ণ সুরক্ষার জন্য দুই ডোজ টিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

এক ডোজ যেন ক্রিকেট ম্যাচে অর্ধেক ব্যাটিং করে মাঠ ছাড়ার মতো – পুরো নিরাপত্তা পাওয়া যায় না!

এই মুহূর্তের ট্রেন্ডিং আর্টিকেলগুলো

শিশুদের মুখের রুচি বাড়ানোর ৪টি পুষ্টিকর রেসিপি

শিশুদের মুখের রুচি বাড়াতে প্রতিদিন বৈচিত্র্যময়, পুষ্টিকর ও রঙিন খাবার পরিবেশন করুন, জোর না করে ধীরে ধীরে নতুন খাবারের সঙ্গে...
Read More

চায়না-৬ লিচু: স্বাদ, অনন্যতা এবং স্বাস্থ্য উপকারিতার আদ্যোপান্ত

চায়না-৬ লিচু বাংলাদেশের জনপ্রিয় একটি উচ্চফলনশীল জাত, যার বড় আকার, আকর্ষণীয় রং, মিষ্টি স্বাদ এবং ভালো ফলন কৃষক ও ভোক্তাদের...
Read More

টাকা বাঁচিয়ে পুষ্টি: ৫০০ টাকায় সপ্তাহের ডায়েট চার্ট

টাকা বাঁচিয়ে পুষ্টি নিশ্চিত করতে ডাল, ডিম, মৌসুমি শাকসবজি, কলা ও দেশি মাছের মতো সাশ্রয়ী খাবার বেছে নিন, যা স্বাস্থ্যকর...
Read More

প্রোবায়োটিক বনাম প্রিবায়োটিক: কিভাবে বুঝবেন কোনটা আপনার দরকার?

প্রোবায়োটিক বনাম প্রিবায়োটিক – সুস্থ অন্ত্রের জন্য দুটিই গুরুত্বপূর্ণ; প্রোবায়োটিক উপকারী ব্যাকটেরিয়া সরবরাহ করে, আর প্রিবায়োটিক সেই ব্যাকটেরিয়ার খাদ্য হিসেবে...
Read More

আতাফল খেলে কী হয়? জেনে নিন এই সুস্বাদু ফলের চমকপ্রদ স্বাস্থ্য উপকারিতা

আতাফলের স্বাস্থ্য উপকারিতা অসংখ্য – এটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ফাইবার, ভিটামিন সি ও পটাশিয়ামে সমৃদ্ধ, যা হজমশক্তি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও হার্টের...
Read More

পঞ্চাশের পরেও থাকুন শক্তিশালী ও কর্মক্ষম: যেসব খাবার খেতেই হবে

পঞ্চাশের পরে যেসব খাবার খেতে হবে তার মধ্যে রয়েছে ডিম, মাছ, মুরগি, ডাল, শাকসবজি, দুধ, বাদাম ও পূর্ণ শস্য, যা...
Read More

গরমে প্রাণ জুড়ানো ৫টি মজাদার আমের ড্রিঙ্ক ও স্মুদি রেসিপি 🥭

গ্রীষ্মকাল মানেই রসালো, মিষ্টি আর সুগন্ধি আমের মৌসুম। শুধু আম কেটে খাওয়াই নয়, এই ফল দিয়ে তৈরি করা যায় দারুণ...
Read More

গরমের প্রাকৃতিক এনার্জি ড্রিংক তালের শাঁস: জানুন ১০টি স্বাস্থ্য উপকারিতা

গরমে তালের শাঁস খেলে শরীর থাকে ঠান্ডা, পানিশূন্যতা কমে, দ্রুত সতেজতা ফিরে আসে এবং প্রাকৃতিকভাবে শক্তি ও প্রশান্তি অনুভূত হয়।...
Read More

গরমে লটকন খান – জানুন স্বাস্থ্য উপকারিতা এবং একটি মুখরোচক রেসিপি

গরমে লটকন খেলে শরীর থাকে সতেজ, পানিশূন্যতা কমে, ভিটামিন সি পাওয়া যায় এবং টক-মিষ্টি স্বাদে মুহূর্তেই মন ও শরীর জুড়িয়ে...
Read More

গ্রীষ্মের মিষ্টি রত্ন লিচু: জানুন লিচু খাওয়ার ১০টি অবিশ্বাস্য উপকারিতা

জানুন লিচু খাওয়ার অবিশ্বাস্য উপকারিতা—এই সুস্বাদু গ্রীষ্মকালীন ফলটি শরীরকে হাইড্রেট রাখে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, শক্তি জোগায় এবং ত্বকের স্বাস্থ্য...
Read More

৩. রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হওয়া

যাদের ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, অপুষ্টি বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি অসুখ আছে, তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে। ফলে ভাইরাস সহজেই আক্রমণ করতে পারে।

৪. গুজব ও টিকাভীতি

অনেক মানুষ এখনও টিকা নিয়ে ভুল ধারণা পোষণ করেন। কেউ ভাবেন টিকা ক্ষতিকর, কেউ আবার অযথা ভয় পান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ভুয়া তথ্যও সমস্যা বাড়াচ্ছে।

ফলে অনেক পরিবার শিশুদের টিকা দিচ্ছেন না। এতে পুরো সমাজ ঝুঁকিতে পড়ে যাচ্ছে।

৫. শহরে ঘনবসতি ও দ্রুত ছড়ানো

ঢাকা বা বড় শহরগুলোতে মানুষের ভিড় অত্যন্ত বেশি। বাস, স্কুল, মার্কেট, অফিস – সব জায়গাতেই ঘনবসতি। হাম ভাইরাস এমন পরিবেশে খুব দ্রুত ছড়ায়।

একজন আক্রান্ত ব্যক্তি পুরো পরিবার বা অফিসে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারেন।

প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য হাম কতটা বিপজ্জনক?

অনেকেই ভাবেন বড়দের হাম হলে সমস্যা কম হয়। কিন্তু বাস্তবে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে জটিলতা আরও গুরুতর হতে পারে।

সম্ভাব্য জটিলতাগুলো হলো:

  • নিউমোনিয়া
  • মারাত্মক ডিহাইড্রেশন
  • কানের ইনফেকশন
  • মস্তিষ্কে প্রদাহ (Encephalitis)
  • শ্বাসকষ্ট
  • মৃত্যু

বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, বৃদ্ধ ব্যক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তদের জন্য হাম খুব বিপজ্জনক।

শিশুদের মধ্যে মৃত্যুহার কেন বাড়ছে?

বাংলাদেশে অনেক শিশু এখনও অপুষ্টিতে ভোগে। অপুষ্ট শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। ফলে হাম হলে তারা দ্রুত গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে।

আরেকটি বড় কারণ হলো চিকিৎসা নিতে দেরি করা। অনেক পরিবার প্রথমে জ্বর বা ফুসকুড়িকে সাধারণ সমস্যা ভেবে বাসায় চিকিৎসা করে সময় নষ্ট করেন। এতে পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যায়।

হাম থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকর উপায় কী?

১. টিকা নেওয়া

হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো টিকা।

শিশুদের সময়মতো হাম-রুবেলা (MR) টিকা দিতে হবে। দুই ডোজ টিকা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

যেসব প্রাপ্তবয়স্ক নিশ্চিত নন যে তারা টিকা নিয়েছেন কিনা, তারা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে টিকা নিতে পারেন।

টিকা হলো শরীরের জন্য এক ধরনের “প্র্যাকটিস ম্যাচ”। আগে থেকেই শরীর ভাইরাসকে চিনে নেয়, ফলে আসল আক্রমণে দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।

২. আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রাখা

হাম খুব দ্রুত ছড়ায়। তাই আক্রান্ত ব্যক্তিকে কিছুদিন আলাদা রাখতে হবে।

স্কুল, অফিস বা জনসমাগমে না যাওয়াই ভালো। এতে অন্যদের সংক্রমণ কমবে।

৩. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা

  • নিয়মিত হাত ধোয়া
  • কাশি বা হাঁচির সময় মুখ ঢেকে রাখা
  • ঘর বাতাস চলাচল উপযোগী রাখা

এসব অভ্যাস সংক্রমণ কমাতে সাহায্য করে।

৪. পুষ্টিকর খাবার খাওয়া

রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পুষ্টিকর খাবার খুব গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে:

  • ডিম
  • মাছ
  • দুধ
  • ফলমূল
  • শাকসবজি

ভিটামিন এ-সমৃদ্ধ খাবার শিশুদের জন্য খুব উপকারী। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন এ ক্যাপসুলও দেওয়া হতে পারে।

৫. গুজব নয়, সঠিক তথ্য বিশ্বাস করুন

ফেসবুক পোস্ট বা ইউটিউব ভিডিও দেখে চিকিৎসা সিদ্ধান্ত নেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুসরণ করা উচিত।

কখন দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে?

নিচের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে:

  • শ্বাসকষ্ট
  • খেতে না পারা
  • অতিরিক্ত দুর্বলতা
  • খিঁচুনি
  • অচেতন হয়ে যাওয়া
  • দীর্ঘসময় উচ্চ জ্বর থাকা

শিশুদের ক্ষেত্রে দেরি না করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের কী করা উচিত?

হাম প্রতিরোধ শুধু ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়, এটি সামাজিক দায়িত্বও। আপনি টিকা না নিলে শুধু নিজে নয়, আশপাশের শিশু, বৃদ্ধ ও দুর্বল মানুষকেও ঝুঁকিতে ফেলতে পারেন।

একসময় অনেকেই ভাবতেন হাম “সাধারণ” রোগ। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, এটিকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ানো, শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করা এবং গুজব প্রতিরোধ করা এখন অত্যন্ত জরুরি।

কারণ হামকে থামানোর সবচেয়ে বড় শক্তি হাসপাতাল নয় – সচেতন মানুষ।

ফেসবুকে কেউ যদি বলে “টিকা নিলে কিছু হয় না”, তাহলে মনে রাখবেন – সিটবেল্টও সব দুর্ঘটনা ঠেকাতে পারে না, কিন্তু জীবন বাঁচানোর সম্ভাবনা অনেক বাড়িয়ে দেয়!

 

Disclaimer

এই আর্টিকেলটি বিভিন্ন স্বীকৃত জার্নালে প্রকাশিত গবেষণার ভিত্তিতে পাঠকদের সুস্থ ও সুন্দর জীবনযাপনে সহায়তার উদ্দেশ্যে লেখা। এটি কোনোভাবেই ডাক্তারি পরামর্শ নয়। ব্যক্তিগত শারীরিক সমস্যা, রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার জন্য অবশ্যই যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here