Home মা ও শিশু গর্ভবতী ও স্তন্যদায়ী মায়েদের পুষ্টি গাইড Maternal Nutrition

গর্ভবতী ও স্তন্যদায়ী মায়েদের পুষ্টি গাইড Maternal Nutrition

11
0
গর্ভবতী মায়েদের পুষ্টি

গর্ভবতী মায়েদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে প্রতিদিন সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত প্রোটিন, শাকসবজি, ফলমূল, দুধ এবং পর্যাপ্ত পানি গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

গর্ভধারণ এবং সন্তানকে স্তন্যদান করা – একটি নারীর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর, আবেগঘন এবং একই সাথে শারীরিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি অধ্যায়। এই পুরো সময়টাতে মায়ের শরীরের ভেতর কেবল একটি নতুন প্রাণের সৃষ্টিই হয় না, বরং সেই প্রাণটিকে পৃথিবীর আলো দেখানোর পর তাকে বাঁচিয়ে রাখার মূল রসদও আসে মায়ের শরীর থেকে।

আমাদের সমাজে গর্ভবতী বা স্তন্যদায়ী মায়েদের খাওয়াদাওয়া নিয়ে অনেক রকম উপকথা, নিয়মকানুন কিংবা কুসংস্কার প্রচলিত আছে। কেউ বলেন “দুই জনের খাবার একবারে খেতে হবে”, আবার কেউ হরেক রকম পুষ্টিকর খাবার খাওয়া থেকে মাকে বিরত রাখেন নানা অমূলক ভয়ে। কিন্তু আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান কী বলে? গর্ভকালীন ও স্তন্যদানকালীন সময়ে একজন মায়ের দৈনিক পুষ্টির চাহিদা কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়েই সাজানো হয়েছে আজকের এই বিস্তারিত গাইডলাইন।

গর্ভকালীন পুষ্টি

গর্ভস্থ শিশুর প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গঠন, মস্তিষ্কের বিকাশ এবং মায়ের নিজের সুস্থতার জন্য এই সময় সুষম খাদ্যাভ্যাস অপরিহার্য। তবে মনে রাখবেন, গর্ভবতী হওয়া মানেই “দুজনের সমপরিমাণ খাবার” খাওয়া নয়, বরং পুষ্টির মান দ্বিগুণ করা।

ত্রৈমাসিক বা ট্রাইমেস্টার অনুযায়ী ক্যালরির চাহিদা

প্রথম ত্রৈমাসিক (১-৩ মাস): এই সময় অতিরিক্ত কোনো ক্যালরির প্রয়োজন হয় না। স্বাভাবিক পুষ্টিকর খাবারই যথেষ্ট। তবে এই সময় বমি ভাব বা মুখের অরুচির কারণে পুষ্টির ঘাটতি হতে পারে, তাই অল্প অল্প করে বারবার খাওয়া উচিত।

দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক (৪-৬ মাস): এই সময় গর্ভস্থ শিশু দ্রুত বড় হতে শুরু করে। তাই মায়ের দৈনিক অতিরিক্ত প্রায় ৩৪০ ক্যালরি প্রয়োজন।

তৃতীয় ত্রৈমাসিক (৭-৯ মাস): শিশুর ওজন বাড়ার মূল সময় এটি। এই সময় দৈনিক অতিরিক্ত প্রায় ৪৫০ ক্যালরি পুষ্টিকর খাবার থেকে গ্রহণ করতে হবে।

এই মুহূর্তের ট্রেন্ডিং আর্টিকেলগুলো

গর্ভবতী ও স্তন্যদায়ী মায়েদের পুষ্টি গাইড Maternal Nutrition

গর্ভবতী মায়েদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে প্রতিদিন সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত প্রোটিন, শাকসবজি, ফলমূল, দুধ এবং পর্যাপ্ত পানি গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।  ...
Read More

শিশুদের মুখের রুচি বাড়ানোর ৪টি পুষ্টিকর রেসিপি

শিশুদের মুখের রুচি বাড়াতে প্রতিদিন বৈচিত্র্যময়, পুষ্টিকর ও রঙিন খাবার পরিবেশন করুন, জোর না করে ধীরে ধীরে নতুন খাবারের সঙ্গে...
Read More

চায়না-৬ লিচু: স্বাদ, অনন্যতা এবং স্বাস্থ্য উপকারিতার আদ্যোপান্ত

চায়না-৬ লিচু বাংলাদেশের জনপ্রিয় একটি উচ্চফলনশীল জাত, যার বড় আকার, আকর্ষণীয় রং, মিষ্টি স্বাদ এবং ভালো ফলন কৃষক ও ভোক্তাদের...
Read More

টাকা বাঁচিয়ে পুষ্টি: ৫০০ টাকায় সপ্তাহের ডায়েট চার্ট

টাকা বাঁচিয়ে পুষ্টি নিশ্চিত করতে ডাল, ডিম, মৌসুমি শাকসবজি, কলা ও দেশি মাছের মতো সাশ্রয়ী খাবার বেছে নিন, যা স্বাস্থ্যকর...
Read More

প্রোবায়োটিক বনাম প্রিবায়োটিক: কিভাবে বুঝবেন কোনটা আপনার দরকার?

প্রোবায়োটিক বনাম প্রিবায়োটিক – সুস্থ অন্ত্রের জন্য দুটিই গুরুত্বপূর্ণ; প্রোবায়োটিক উপকারী ব্যাকটেরিয়া সরবরাহ করে, আর প্রিবায়োটিক সেই ব্যাকটেরিয়ার খাদ্য হিসেবে...
Read More

আতাফল খেলে কী হয়? জেনে নিন এই সুস্বাদু ফলের চমকপ্রদ স্বাস্থ্য উপকারিতা

আতাফলের স্বাস্থ্য উপকারিতা অসংখ্য – এটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ফাইবার, ভিটামিন সি ও পটাশিয়ামে সমৃদ্ধ, যা হজমশক্তি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও হার্টের...
Read More

পঞ্চাশের পরেও থাকুন শক্তিশালী ও কর্মক্ষম: যেসব খাবার খেতেই হবে

পঞ্চাশের পরে যেসব খাবার খেতে হবে তার মধ্যে রয়েছে ডিম, মাছ, মুরগি, ডাল, শাকসবজি, দুধ, বাদাম ও পূর্ণ শস্য, যা...
Read More

গরমে প্রাণ জুড়ানো ৫টি মজাদার আমের ড্রিঙ্ক ও স্মুদি রেসিপি 🥭

গ্রীষ্মকাল মানেই রসালো, মিষ্টি আর সুগন্ধি আমের মৌসুম। শুধু আম কেটে খাওয়াই নয়, এই ফল দিয়ে তৈরি করা যায় দারুণ...
Read More

গরমের প্রাকৃতিক এনার্জি ড্রিংক তালের শাঁস: জানুন ১০টি স্বাস্থ্য উপকারিতা

গরমে তালের শাঁস খেলে শরীর থাকে ঠান্ডা, পানিশূন্যতা কমে, দ্রুত সতেজতা ফিরে আসে এবং প্রাকৃতিকভাবে শক্তি ও প্রশান্তি অনুভূত হয়।...
Read More

গরমে লটকন খান – জানুন স্বাস্থ্য উপকারিতা এবং একটি মুখরোচক রেসিপি

গরমে লটকন খেলে শরীর থাকে সতেজ, পানিশূন্যতা কমে, ভিটামিন সি পাওয়া যায় এবং টক-মিষ্টি স্বাদে মুহূর্তেই মন ও শরীর জুড়িয়ে...
Read More

গর্ভকালীন অপরিহার্য পুষ্টি উপাদানসমূহ

পুষ্টি উপাদানের নাম কেন প্রয়োজন? উৎস
ফলিক অ্যাসিড শিশুর জন্মগত ত্রুটি (যেমন: নিউরাল টিউব ডিফেক্ট) রোধে। গাঢ় সবুজ শাকসবজি, ডাল, সাইট্রাস জাতীয় ফল (লেবু, কমলা), বাদাম।
আয়রন বা লৌহ রক্তস্বল্পতা দূর করতে এবং শিশুর শরীরে রক্ত সঞ্চালন বাড়াতে। লাল মাংস, কলিজা, ডিমের কুসুম, কচুশাক, খেঁজুর, বেদানা।
ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি শিশুর হাড় ও দাঁতের গঠন মজবুত করতে এবং মায়ের হাড়ের ক্ষয় রোধে। দুধ, দই, ছানা, ছোট মাছ (কাঁটাসহ), ডিম।
প্রোটিন বা আমিষ শিশুর কোষ ও টিস্যুর সঠিক বৃদ্ধির জন্য। মাছ, মুরগির মাংস, ডিম, ডাল, শিমের বিচি।
ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড শিশুর চোখ ও মস্তিষ্কের পুষ্টির জন্য। সামুদ্রিক মাছ, রুই-কাতলা মাছের তেল, আখরোট, চিয়া সিড।

 

স্তন্যদানকালীন পুষ্টি

অনেক মা গর্ভকালীন সময়ে নিজের যত্ন নিলেও, সন্তান জন্মের পর পুরো মনোযোগ শিশুর দিকে চলে যায় এবং নিজের খাওয়া-দাওয়ায় অবহেলা করেন। এটি একটি মারাত্মক ভুল। বুকের দুধ তৈরি হতে মায়ের শরীর থেকে প্রচুর শক্তি ও পুষ্টি খরচ হয়। তাই স্তন্যদায়ী মায়ের পুষ্টির চাহিদা গর্ভকালীন সময়ের চেয়েও বেশি হতে পারে।

ক্যালরি ও পুষ্টির চাহিদা

একজন স্তন্যদায়ী মায়ের দৈনিক স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত প্রায় ৫০০ ক্যালরি শক্তির প্রয়োজন হয়। মা যদি পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার না খান, তবে শিশুর দুধের পুষ্টি ঠিক রাখতে মায়ের নিজের শরীরের সঞ্চিত পুষ্টি উপাদান শেষ হতে থাকে, যার ফলে মা পরবর্তীতে চরম শারীরিক দুর্বলতা ও হাড়ের ব্যথায় ভোগেন।

বুকের দুধের উৎপাদন বাড়াতে এবং পুষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় খাবার

১. পর্যাপ্ত তরল খাবার: বুকের দুধের প্রায় ৮৭% অংশই পানি। তাই স্তন্যদায়ী মাকে দৈনিক ৩-৪ লিটার পানি, ডাবের পানি, তাজা ফলের রস বা পাতলা স্যুপ খেতে হবে। প্রতিবার শিশুকে দুধ খাওয়ানোর আগে ও পরে এক গ্লাস পানি খাওয়ার অভ্যাস করা ভালো।

২. ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার: প্রতিদিন অন্তত ২ গ্লাস দুধ বা সমপরিমাণ দই খেতে হবে। শিশু মায়ের দুধ থেকে প্রচুর ক্যালসিয়াম গ্রহণ করে, যা মায়ের খাদ্য থেকে পূরণ না হলে মায়ের হাড় দুর্বল হয়ে যায়।

৩. লাউ ও কালিজিরা: ঐতিহ্যগত এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে কালিজিরা এবং লাউয়ের মতো সবজি স্তন্যদায়ী মায়ের বুকের দুধের প্রবাহ (Lactation) বাড়াতে দারুণ সাহায্য করে।

৪. জটিল শর্করা ও ওটস: লাল চালের ভাত, ওটস বা ডালিয়া মায়ের শরীরে দীর্ঘক্ষণ শক্তি জোগায় এবং ক্লান্তি দূর করে।

গর্ভবতী ও স্তন্যদায়ী মায়েদের জন্য আদর্শ প্লেট ডিজাইন

সুস্থ ও সুষম ডায়েটের জন্য প্রতিদিনের প্রধান খাবারগুলোতে (লাঞ্চ ও ডিনার) নিচের অনুপাতটি মেনে চলা উচিত:

প্লেটের অর্ধেক (৫০%): নানা রঙের সবজি (যেমন: গাজর, মিষ্টি কুমড়া, লাউ, পটল) এবং শাক।

প্লেটের এক-চতুর্থাংশ (২৫%): প্রথম শ্রেণীর প্রোটিন যেমন মাছ, চর্বিহীন মাংস বা ডিম।

অবশিষ্ট এক-চতুর্থাংশ (২৫%): লাল চালের ভাত, রুটি বা ডালিয়া।

পাশাপাশি: প্রতিদিন অন্তত একটি টক জাতীয় ফল (ভিটামিন সি আয়রন শোষণে সাহায্য করে) এবং এক বাটি ডাল বা দুগ্ধজাত খাবার।

যা কিছু সম্পূর্ণ বর্জন করা উচিত

গর্ভকালীন এবং স্তন্যদানকালীন সময়ে কিছু খাবার মা ও শিশু উভয়ের জন্যই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে:

কাঁচা বা আধা-সেদ্ধ খাবার

কাঁচা ডিম (বা মেয়নেজ), আধা সেদ্ধ মাংস বা আনপাস্তুরিত কাঁচা দুধ খাওয়া যাবে না। এগুলোতে লিস্টেরিয়া বা সালমোনেলার মতো ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে, যা গর্ভপাতের কারণ হতে পারে।

অতিরিক্ত ক্যাফিন

চা, কফি বা কোল্ড ড্রিংকস খাওয়া একদম কমিয়ে আনতে হবে (দৈনিক ২০০ মিলিগ্রাম বা ১ কাপের বেশি নয়)। অতিরিক্ত ক্যাফেইন শিশুর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় এবং কম ওজনের শিশু জন্মের ঝুঁকি বাড়ায়।

পারদযুক্ত মাছ

কিছু সামুদ্রিক মাছে (যেমন: টুনা, হাঙ্গর) উচ্চমাত্রায় পারদ বা মার্কারি থাকে, যা শিশুর স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে। সাধারণ দেশি মাছ খাওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

বাইরের খোলা বা বাসি খাবার

টাইফয়েড বা জন্ডিসের মতো পানি ও খাদ্যবাহিত রোগ থেকে বাঁচতে রাস্তার খোলা খাবার বা ফুচকা-চাটনি পুরোপুরি এড়িয়ে চলতে হবে।

কিছু প্রচলিত কুসংস্কার এবং পুষ্টিবিজ্ঞান

ভুল ধারণা: গর্ভবতী বা স্তন্যদায়ী মা টক ফল খেলে শিশুর ঠান্ডা লাগবে।

সত্য: টক ফলে থাকে ভিটামিন সি, যা মায়ের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং খাবারে থাকা আয়রন শরীরে শোষণ করতে সাহায্য করে। এর সাথে শিশুর ঠান্ডা লাগার কোনো বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক নেই।

ভুল ধারণা: সন্তান প্রসবের পর মাকে প্রথম কয়েকদিন পানি কম খেতে হবে, নয়তো পেট নামবে।

সত্য: এটি একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক কুসংস্কার। সিজারিয়ান বা নরমাল ডেলিভারির পর মায়ের শরীর পুনর্গঠন এবং বুকের দুধ তৈরির জন্য পর্যাপ্ত পানির কোনো বিকল্প নেই।

শেষ কথা

গর্ভকাল এবং স্তন্যদানকাল—কোনোটিই অসুস্থতা নয়, এটি জীবনের একটি স্বাভাবিক ও সুন্দর প্রক্রিয়া। এই সময়ে মায়ের কোনো কঠোর ডায়েট বা ওজন কমানোর চিন্তা করা উচিত নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আয়রন, ক্যালসিয়াম ও ফলিক অ্যাসিডের সাপ্লিমেন্ট নিয়মিত খাওয়ার পাশাপাশি একটি রঙিন, সুষম এবং ঘরে তৈরি খাবারের প্লেটই পারে একজন মা ও তার সন্তানকে আজীবন সুস্থ ও প্রাণবন্ত রাখতে।

Previous articleশিশুদের মুখের রুচি বাড়ানোর ৪টি পুষ্টিকর রেসিপি
Avatar
সালাহউদ্দিন আহমেদ আজাদ একজন 🥦পুষ্টি ও 👴দীর্ঘায়ু বিষয়ক গবেষক ও লেখক, এবং অভিনেতা। তিনি ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি হাই স্কুল, নটর ডেম কলেজ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ লুইজিয়ানা, লাফায়েত-এ পড়াশোনা করেছেন। দুই ছেলের গর্বিত বাবা আজাদ 📚বই পড়া, 🚀ভ্রমণ, 💪ওয়ার্কআউট, 🍅গার্ডেনিং ও 📷ফটোগ্রাফি পছন্দ করেন। জটিল স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য সহজভাবে উপস্থাপন করাই তার লেখার মূল শক্তি। সুস্থ ও দীর্ঘ জীবন নিয়ে মানুষকে সচেতন করাই তার লক্ষ্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here