এমআইটি-র প্রকৌশলীরা দেখিয়েছেন যে, ত্বকের ওপর নিয়ার-ইনফ্রারেড আলো ফেলে তাঁরা রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা নির্ভুলভাবে পরিমাপ করতে পারেন।
রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পরিমাপের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটিতে উদ্ভাবিত একটি সুঁচবিহীন পদ্ধতি ডায়াবেটিস রোগীদের ঘন ঘন আঙুল ফুটো করা থেকে মুক্তি দিতে পারে এবং প্রচলিত পরিমাপ ডিভাইসগুলোর সম্ভাব্য বিকল্প হতে পারে।
এমআইটি’র বিজ্ঞানীদের দলটি রামান স্পেকট্রোস্কোপি ব্যবহার করে জুতার বাক্সের আকারের একটি যন্ত্র তৈরি করেছে, যা কোনো সুই ব্যবহার না করেই রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পরিমাপ করতে পারে। রামান স্পেকট্রোস্কোপি হলো এমন একটি কৌশল যা শরীরের টিস্যুর উপর নিয়ার-ইনফ্রারেড বা দৃশ্যমান আলো ফেলে তার রাসায়নিক গঠন প্রকাশ করে।
একজন সুস্থ স্বেচ্ছাসেবকের উপর পরীক্ষায় গবেষকরা দেখেছেন যে, তাদের ডিভাইস থেকে প্রাপ্ত পরিমাপগুলো বাণিজ্যিক কন্টিনিউয়াস গ্লুকোজ মনিটরিং সেন্সরগুলোর পরিমাপের মতোই। যদিও এই গবেষণায় উপস্থাপিত ডিভাইসটি পরিধেয় সেন্সর হিসেবে ব্যবহারের জন্য বেশ বড়, গবেষকরা এরপর এর একটি পরিধেয় সংস্করণ তৈরি করেছেন, যা তারা এখন একটি ছোট ক্লিনিক্যাল গবেষণায় পরীক্ষা করছেন।
“দীর্ঘদিন ধরে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা মাপার জন্য আঙুল ফুটো করাই ছিল প্রচলিত পদ্ধতি, কিন্তু কেউই প্রতিদিন একাধিকবার আঙুল ফুটো করতে চান না। স্বাভাবিকভাবেই, অনেক ডায়াবেটিস রোগী প্রয়োজনের চেয়ে কম রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পরীক্ষা করান, যা গুরুতর জটিলতার কারণ হতে পারে,” বলেন এমআইটি-র গবেষক বিজ্ঞানী এবং এই গবেষণার প্রধান লেখক জেওন উং কাং। “যদি আমরা উচ্চ নির্ভুলতা সম্পন্ন একটি নন-ইনভেসিভ গ্লুকোজ মনিটর তৈরি করতে পারি, তাহলে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রায় সকলেই এই নতুন প্রযুক্তি থেকে উপকৃত হবেন।”

যদিও বেশিরভাগ ডায়াবেটিস রোগী রক্ত নিয়ে গ্লুকোমিটার দিয়ে পরীক্ষা করে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পরিমাপ করেন, আবার কেউ কেউ পরিধেয় গ্লুকোজ মনিটর ব্যবহার করেন, যেগুলোতে একটি সেন্সর থাকে যা ত্বকের ঠিক নিচে স্থাপন করা হয়। এই সেন্সরগুলো আন্তঃকোষীয় তরল থেকে অবিচ্ছিন্নভাবে গ্লুকোজের পরিমাপ প্রদান করে, কিন্তু এগুলো ত্বকে জ্বালা সৃষ্টি করতে পারে এবং প্রতি ১০ থেকে ১৫ দিন পর পর এগুলো প্রতিস্থাপন করার প্রয়োজন হয়।
রোগীদের জন্য আরও আরামদায়ক পরিধেয় গ্লুকোজ মনিটর তৈরির আশায়, এমআইটি-র এলবিআরসি-র গবেষকরা রামান স্পেকট্রোস্কোপি-ভিত্তিক নন-ইনভেসিভ সেন্সর নিয়ে কাজ করে চলেছেন। এই ধরনের স্পেকট্রোস্কোপি বিভিন্ন অণুর সংস্পর্শে এসে নিয়ার-ইনফ্রারেড আলো কীভাবে বিক্ষিপ্ত বা বিচ্যুত হয়, তা বিশ্লেষণ করে টিস্যু বা কোষের রাসায়নিক গঠন প্রকাশ করে।
এই মুহূর্তের ট্রেন্ডিং আর্টিকেলগুলো
গবেষণা
এমআইটি সেন্টার ফর ক্লিনিকাল ট্রান্সলেশন রিসার্চ (সিসিটিআর) এ সঞ্চালিত একটি ক্লিনিকাল গবেষণায়, গবেষকরা চার ঘন্টা সময় ধরে একজন সুস্থ মানুষের কাছ থেকে রিডিং নেওয়ার জন্য নতুন ডিভাইসটি ব্যবহার করেছেন। মানুষটি ডিভাইসের উপরে তার হাত রাখার সাথে সাথে, একটি নিয়ার-ইনফ্রারেড বিম একটি ছোট কাচের জানালার মধ্য দিয়ে পরিমাপ করার জন্য ত্বকের উপর জ্বলজ্বল করতে থাকে।
প্রতিটি পরিমাপে ৩০ সেকেন্ডের কিছু বেশি সময় লাগে এবং গবেষকরা প্রতি পাঁচ মিনিট অন্তর নতুন করে রিডিং নেন।
গবেষণা চলাকালীন, অংশগ্রহণকারী দুটি ৭৫-গ্রাম গ্লুকোজ পানীয় গ্রহণ করেন, যা গবেষকদের রক্তে গ্লুকোজের ঘনত্বের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ করে দেয়। তাঁরা দেখতে পান যে, রামান-ভিত্তিক ডিভাইসটি অংশগ্রহণকারীর পরিহিত দুটি বাণিজ্যিক, ইনভেসিভ গ্লুকোজ মনিটরের মতোই নির্ভুলতার মাত্রা দেখিয়েছে।
গবেষণাটি শেষ করার পর, গবেষকরা একটি মোবাইল ফোনের সমান ছোট একটি প্রোটোটাইপ তৈরি করেছেন, যা তাঁরা বর্তমানে এমআইটি সিসিটিআর-এ সুস্থ এবং প্রিডায়াবেটিক স্বেচ্ছাসেবকদের উপর পরিধেয় মনিটর হিসেবে পরীক্ষা করছেন। আগামী বছর, তাঁরা একটি স্থানীয় হাসপাতালের সাথে মিলে একটি বৃহত্তর গবেষণা চালানোর পরিকল্পনা করছেন, যেখানে ডায়াবেটিস রোগীদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
এছাড়া গবেষকরা ডিভাইসটিকে আরও ছোট, প্রায় একটি ঘড়ির আকারের করার জন্যও কাজ করছেন। এছাড়াও, তারা এমন উপায় খুঁজছেন যাতে ডিভাইসটি বিভিন্ন গাত্রবর্ণের মানুষের কাছ থেকেও সঠিক পাঠ নিতে পারে।
গবেষণাটিতে অর্থায়ন করেছে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অফ হেলথ, কোরিয়ান টেকনোলজি অ্যান্ড ইনফরমেশন প্রোমোশন এজেন্সি ফর এসএমই এবং অ্যাপোলোন ইনকর্পোরেটেড।








