বেসাল ইনসুলিন গ্রহণকারী টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা কন্টিনিউয়াস গ্লুকোজ মনিটরিং (CGM) শুরু করার পর, যারা CGM ব্যবহার করেননি তাদের তুলনায় এক বছর পর যেকোনো কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি ৪৪% কম ছিল। দুই বছর পরও মৃত্যুর ঝুঁকি ৩৫% কম ছিল। ইতালির মিলানে ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ২ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত European Association for the Study of Diabetes (EASD)-এর বার্ষিক সভায় উপস্থাপিত একটি রোগী-তথ্য বিশ্লেষণে এই তথ্য উঠে এসেছে।
CGM (Continuous Glucose Monitor) হলো একটি পরিধেয় ডিভাইস, যা ত্বকের নিচে ছোট সেন্সরের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করে। এটি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে, গ্লুকোজের ওঠানামা বুঝতে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করে।
গবেষকরা বলছেন, এটি প্রথমবারের মতো এমন প্রমাণ পাওয়া গেল যে উন্নত প্রযুক্তির CGM ব্যবহারের সঙ্গে বেসাল ইনসুলিন গ্রহণকারী টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের মৃত্যুঝুঁকি কমার একটি সম্পর্ক রয়েছে। এসব রোগী ইনসুলিনের পাশাপাশি অন্যান্য ইনসুলিন-বহির্ভূত ডায়াবেটিসের ওষুধও গ্রহণ করতে পারেন। গবেষণায় হৃদ্রোগসহ অন্যান্য কার্ডিওভাসকুলার (হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালিসংক্রান্ত) ঘটনার ঝুঁকিও কম দেখা গেছে।
অনুমান করা হয়, বিশ্বব্যাপী টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রায় ৪০ কোটি ৫০ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ৭% – অর্থাৎ প্রায় ৩ কোটি মানুষ – ইনসুলিন থেরাপির প্রয়োজন হয়। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রাখা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেশি থাকলে হৃদ্রোগ, অন্ধত্ব ও স্ট্রোকসহ গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
CGM হলো এমন একটি প্রযুক্তি, যেখানে ত্বকের ওপর একটি ছোট সেন্সর পরানো হয়। এটি নিয়মিত রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা পরিমাপ করে এবং সেই তথ্য মোবাইল ডিভাইস, বিশেষ রিডার বা স্বয়ংক্রিয় ইনসুলিন সরবরাহ ব্যবস্থায় পাঠায়। ফলে মানুষ প্রায় সবসময় নিজের গ্লুকোজের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করতে পারেন এবং জীবনযাপন বা ইনসুলিন চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সম্পর্কে আরও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
এই মুহূর্তের ট্রেন্ডিং আর্টিকেলগুলো
CGM টাইপ-১ ও টাইপ-২ – উভয় ধরনের ডায়াবেটিসের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং হাইপোগ্লাইসেমিয়া, অর্থাৎ বিপজ্জনকভাবে রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যাওয়ার ঘটনা, নিয়ন্ত্রণেও সাহায্য করতে পারে। তবে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে দীর্ঘমেয়াদি অন্যান্য জটিলতা কমাতে CGM-এর ভূমিকা কতটা, তা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
এ বিষয়ে আরও জানতে Abbott এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষকরা Truveta প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেন। Truveta এমন একটি ডেটাবেস, যেখানে ১৪ কোটিরও বেশি আমেরিকানের পরিচয়-গোপন করা ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড রয়েছে।
গবেষকরা ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ১৮ মার্চ পর্যন্ত বেসাল ইনসুলিন গ্রহণকারী টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে যেকোনো কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি এবং প্রথম ও পুনরাবৃত্ত ম্যাক্রোভাসকুলার ঘটনা – যেমন হার্ট অ্যাটাক, হার্ট ফেইলিউর, স্ট্রোক, ট্রানজিয়েন্ট ইস্কেমিক অ্যাটাক (TIA) এবং পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজ – ঘটার ঝুঁকি বিশ্লেষণ করেন।
Target trial emulation পদ্ধতিতে পরিচালিত এই গবেষণায় প্রথমবার CGM-এর প্রেসক্রিপশন নিয়েছিলেন এমন ১৩,৯৩৫ জন রোগীর সঙ্গে CGM ব্যবহার করেননি এমন ১৩,৯৩৫ জন রোগীর তুলনা করা হয়।

গবেষণা শুরুর সময় দুই দলের রোগীদের ২৯টি বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে মিলিয়ে নেওয়া হয়েছিল, যাতে অন্যান্য পার্থক্যের কারণে ফলাফলে বিভ্রান্তি কমে। এসব বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ছিল বয়স, লিঙ্গ, জাতিগত পরিচয়, ডায়াবেটিসের স্থায়িত্ব, ডায়াবেটিসজনিত জটিলতার তীব্রতা, HbA1c দিয়ে পরিমাপ করা রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণ, অন্যান্য সহ-বিদ্যমান রোগ, ওষুধের ব্যবহার, কত ঘন ঘন স্বাস্থ্যসেবা নেওয়া হয়েছে এবং রক্তে গ্লুকোজ মাপার যন্ত্রের ব্যবহার। অংশগ্রহণকারীদের গড় বয়স ছিল ৫৮ বছর এবং ৪৭% ছিলেন নারী।
সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, CGM ব্যবহারকারীদের মধ্যে গবেষণায় পরিমাপ করা সব ধরনের ফলাফলের ঝুঁকি – এক বছর এবং দুই বছর পর উভয় সময়েই – কম ছিল।
১২ মাস পর
CGM ব্যবহারকারীদের যেকোনো কারণে মৃত্যুর সম্ভাবনা CGM ব্যবহার না করা ব্যক্তিদের তুলনায় ৪৪% কম ছিল।
- CGM ব্যবহারকারীদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছিল ১.১৬% মানুষের।
- CGM ব্যবহার না করা ব্যক্তিদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছিল ২.০৯% মানুষের।
২৪ মাস পর
দুই বছর পর CGM ব্যবহারকারীদের যেকোনো কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি ৩৫% কম ছিল।
- CGM ব্যবহারকারীদের মধ্যে মৃত্যুর হার ছিল ২.১২%।
- CGM ব্যবহার না করা ব্যক্তিদের মধ্যে ছিল ৩.২৬%।
একইভাবে, নতুন কোনো ম্যাক্রোভাসকুলার ঘটনা ঘটার ঝুঁকিও CGM ব্যবহারকারীদের মধ্যে কম ছিল।
- ১২ মাস পর ঝুঁকি ছিল ২৬% কম (CGM ব্যবহারকারী ১.০৩% বনাম ব্যবহার না করা ১.৩৯%)।
- ২৪ মাস পর ঝুঁকি ছিল ২৪% কম (১.৬৪% বনাম ২.১৭%)।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, আগে ম্যাক্রোভাসকুলার ঘটনা ঘটেছে এমন ব্যক্তিদের মধ্যে পুনরায় ম্যাক্রোভাসকুলার ঘটনা ঘটার হারও CGM ব্যবহারকারীদের মধ্যে কম ছিল।
- ১২ মাস পর এই হার ৩৫% কম।
- ২৪ মাস পর ৩৬% কম।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, হার্ট ফেইলিউরের কারণে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার হার CGM ব্যবহারকারীদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক ছিল।
- ১২ মাস পর হার ৫৪% কম।
- ২৪ মাস পর হার ৪৭% কম।
এ ছাড়া, কোভিড-১৯ মহামারির সময়কাল বাদ দিয়ে এবং গবেষণার প্রথম ৯০ দিনের মধ্যে হওয়া মৃত্যুগুলো বাদ দিয়েও যখন বিভিন্নভাবে তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়, তখনও ফলাফল মোটামুটি একই ছিল।
গবেষণার প্রধান গবেষক ও University Hospital of Freiburg-এর অধ্যাপক Jochen Seufert বলেন:
“আমাদের গবেষণা ইঙ্গিত করে যে ইনসুলিন প্রয়োজন এমন টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যে CGM বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।”
তিনি আরও বলেন:
“এই ফলাফলগুলো বেসাল ইনসুলিন থেরাপি গ্রহণকারী এবং CGM থেকে উপকৃত হতে পারেন – এমন টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য CGM ব্যবহারের সুযোগ আরও বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি শক্তিশালী করে। ডায়াবেটিস প্রযুক্তির ন্যায্য ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানুষ যাতে এই প্রযুক্তি কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তাও নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যাতে কেউ পিছিয়ে না পড়েন।”
তবে গবেষকরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করেছেন।
এটি একটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক (observational) গবেষণা হওয়ায়, CGM ব্যবহারের কারণেই যে হৃদ্রোগজনিত ঘটনা ও মৃত্যুর হার কমেছে – তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। গবেষণায় সম্ভাব্য প্রভাব ফেলতে পারে এমন ২৯টি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে রোগীদের মিলিয়ে নেওয়া হলেও, পরিমাপ করা হয়নি এমন অন্য কোনো কারণ ফলাফলকে প্রভাবিত করেছে কি না, তা পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব নয়।
গবেষণার আরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেমন, ফলোআপ চলাকালে রোগীদের ওষুধের পরিবর্তন এবং সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত অন্যান্য ক্লিনিক্যাল বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা হয়নি। পাশাপাশি, গবেষণায় অংশ নেওয়া রোগীরা বেসাল ইনসুলিন গ্রহণকারী সব টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীর প্রতিনিধিত্ব নাও করতে পারেন।
তাই গবেষকরা মনে করেন, এই ফলাফল নিশ্চিত করতে এবং বিষয়টি আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য বৃহত্তর ও prospective গবেষণা প্রয়োজন।
✍️ লেখক: সালাহউদ্দিন আহমেদ আজাদ
📅 সর্বশেষ হালনাগাদ: ১০ অক্টোবর ২০২৬
📚 তথ্যসূত্র: PubMed | WHO | NIH | CDC
মেডিকেল ডিসক্লেইমার:
এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। বিভিন্ন স্বীকৃত জার্নালে প্রকাশিত গবেষণার ভিত্তিতে পাঠকদের সুস্থ ও সুন্দর জীবনযাপনে সহায়তার উদ্দেশ্যে এই আর্টিকেলটি লেখা হয়েছে। এটি কোনোভাবেই ডাক্তারি পরামর্শ নয়। ব্যক্তিগত শারীরিক সমস্যা, রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার জন্য অবশ্যই যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।








