রোগ শনাক্তে স্মার্টওয়াচ আধুনিক স্বাস্থ্য প্রযুক্তির নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে, যা হৃদস্পন্দন, রক্তের অক্সিজেন, ঘুম ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যতথ্য পর্যবেক্ষণ করে আগাম সতর্কতা দিতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার Murdoch Children’s Research Institute (MCRI)-এর একটি নতুন গবেষণায় দেখা হচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত স্মার্টওয়াচ একসঙ্গে ব্যবহার করে ক্যানসারে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার সময় ইনফেকশনের প্রাথমিক লক্ষণ আগেভাগেই শনাক্ত করা যায় কি না।
গবেষণাটি শুধু স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহেই সীমাবদ্ধ নয়। এবার গবেষকেরা বাস্তবে Apple Watch এবং বিশেষভাবে তৈরি একটি অ্যাপ ব্যবহার করে পরীক্ষা করবেন, এটি শিশুদের কেমোথেরাপির সময় সংক্রমণের আগাম সতর্কবার্তা দিতে পারে কি না।
এই গবেষণার নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রফেসর র্যাচেল কনিয়ার্স। পরীক্ষাটি পরিচালিত হবে অস্ট্রেলিয়ার The Royal Children’s Hospital-এ।
কীভাবে কাজ করবে এই প্রযুক্তি?
শুরুতে WEARABLES নামে গবেষণা প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল Apple Watch-এর ECG ফিচার ব্যবহার করে শিশু ক্যানসার রোগীদের কাছ থেকে কতটা কার্যকর স্বাস্থ্যতথ্য সংগ্রহ করা যায়, তা জানা।
এখন গবেষণার পরবর্তী ধাপে বিজ্ঞানীরা জানতে চান, Apple Watch-এর মাধ্যমে সারাক্ষণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংগৃহীত স্বাস্থ্যতথ্য এবং AI বিশ্লেষণ একসঙ্গে ব্যবহার করে ইনফেকশনের আগাম লক্ষণ ধরা সম্ভব কি না।
গবেষক দলের সদস্য এবং ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্নের পিএইচডি গবেষক লেন কলিয়ার (Len Collier) বলেন, তাঁদের লক্ষ্য এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যা পরিবারের জন্য সহজ হবে এবং চিকিৎসকদেরও সময়মতো সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।
আরও পড়ুন Apple Watch-এর কারণে প্রাণে বাঁচলেন এক ব্যক্তি, বলছেন এটি ছিল তাঁর মেয়ের উপহার
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
শিশুদের ক্যানসারের চিকিৎসায় অনেক উন্নতি হলেও চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এখনও বড় একটি সমস্যা।
MCRI-এর তথ্য অনুযায়ী:
- প্রতি ১০ জন শিশু ক্যানসার থেকে সুস্থ হওয়া রোগীর মধ্যে ৬ জন অন্তত একটি দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগে।
- ২৫ শতাংশেরও বেশি রোগীর গুরুতর বা জীবনহানিকর স্বাস্থ্যজটিলতা দেখা দেয়।
- যেসব শিশুর চিকিৎসাজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়, তাদের প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জনকেই সংক্রমণের চিকিৎসা নিতে হয়।

শিশুদের ক্ষেত্রে সংক্রমণ দ্রুত বিপজ্জনক হতে পারে
বিশেষ করে কেমোথেরাপির কারণে যেসব শিশুর শরীরে নিউট্রোফিল (সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করা শ্বেত রক্তকণিকা) কমে যায়, তাদের ক্ষেত্রে সামান্য সংক্রমণও খুব দ্রুত গুরুতর আকার নিতে পারে।
গবেষকদের মতে, অনেক সময় শিশুর বাবা-মাই প্রথম বুঝতে পারেন যে শিশুর আচরণ বা শারীরিক অবস্থায় সূক্ষ্ম পরিবর্তন এসেছে।
যদি স্মার্টওয়াচ সেই পরিবর্তনগুলো আগেই শনাক্ত করতে পারে, তাহলে চিকিৎসা আরও দ্রুত শুরু করা সম্ভব হতে পারে।
এই মুহূর্তের ট্রেন্ডিং আর্টিকেলগুলো
বর্তমান প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা
গবেষক লেন কলিয়ার বলেন, বর্তমানে ব্যবহৃত অনেক AI মডেল এবং চিকিৎসা নির্দেশিকা প্রাপ্তবয়স্কদের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
অন্যদিকে শিশু ক্যানসার রোগীদের জন্য রিয়েল-টাইম স্মার্টওয়াচ মনিটরিং নিয়ে এখনও পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি।
এই গবেষণার উদ্দেশ্য হলো, সেই ঘাটতি পূরণ করা এবং বোঝা – এই প্রযুক্তি বাস্তবে কতটা কার্যকর হতে পারে।
আরও পড়ুন পরিধেয় প্রযুক্তি ডেটা-নির্ভর স্বাস্থ্যসেবার পথ প্রশস্ত করছে
ভবিষ্যতে কী পরিবর্তন আনতে পারে?
গবেষকেরা মনে করেন, যদি AI-সমর্থিত স্মার্টওয়াচ নির্ভরযোগ্যভাবে সংক্রমণের ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করতে পারে, তাহলে এটি চিকিৎসাব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
বিশেষ করে –
- যেসব পরিবার হাসপাতাল থেকে অনেক দূরে থাকে,
- যেখানে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা কম,
- অথবা যেখানে রোগীরা দেরিতে হাসপাতালে পৌঁছায়,
সেসব ক্ষেত্রে বাড়িতে বসেই একটি স্মার্টওয়াচ আগাম সতর্কবার্তা দিতে পারলে শিশুর জীবন বাঁচানোর সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যেতে পারে।

তবে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে
গবেষকদের মতে, এই প্রযুক্তি সবার জন্য সহজলভ্য করতে হলে কয়েকটি সমস্যা সমাধান করতে হবে।
যেমন –
- স্মার্টওয়াচের দাম কমানো,
- আরও বেশি ধরনের স্মার্টফোনের সঙ্গে কাজ করার সুবিধা,
- ইন্টারনেট ছাড়াও কাজ করার সক্ষমতা,
এবং বিভিন্ন দেশের ও বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর তথ্য ব্যবহার করে আরও নির্ভুল AI মডেল তৈরি করা।
স্মার্টওয়াচে বাড়ছে স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা
বর্তমানে Apple Watch-এ ইতোমধ্যে অনেক স্বাস্থ্যসেবা ফিচার রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো –
- উচ্চ রক্তচাপের সতর্কবার্তা,
- ঘুমের মান (Sleep Score),
- ECG,
- অনিয়মিত হৃদস্পন্দন শনাক্তকরণ,
- দৈনন্দিন শারীরিক কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ,
- ঘুম পর্যবেক্ষণ,
- কিছু মডেলে রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা পরিমাপ,
- মানসিক স্বাস্থ্যের সহায়ক ফিচার,
- এবং খিঁচুনি (Seizure) শনাক্ত করার তৃতীয় পক্ষের অ্যাপ।
এদিকে এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও স্মার্টওয়াচ ব্যবহার করে ডায়াবেটিস, স্ট্রোক, দীর্ঘমেয়াদি রোগ পর্যবেক্ষণ এবং এমনকি মানসিক অবস্থার পরিবর্তন পূর্বাভাস দেওয়ার মতো প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা দ্রুত এগিয়ে চলছে।








