নতুন পরিধেয় প্রযুক্তি (Wearable Technology)-এর অগ্রগতি সম্পর্কে জানুন, যা আপনার পোশাকের ভেতরেই স্মার্ট সেন্সর যুক্ত করে সেটিকে একটি স্মার্ট পোশাকে রূপান্তরিত করতে পারে।
যারা আগে স্মার্ট পোশাক (Smart Clothing) ব্যবহার করেছেন, তারা জানেন যে, এটা খুব একটা কমফোর্টেবল নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব smart clothing দেখতে সাধারণ পোশাকের মতো হলেও বুকে একটি প্লাস্টিকের ডিভাইস লাগানো থাকে বা কাপড়ের ভেতরে শক্ত তার দিয়ে বসানো থাকে। ফলে এগুলো পরতে অস্বস্তিকর লাগে, দেখতে অস্বাভাবিক মনে হয়, এমনকি কাপড় ধোয়ার আগে ইলেকট্রনিক অংশ খুলে ফেলতেও হয়।
তবে এখন নতুন এক প্রযুক্তি সেই ধারণাই বদলে দিচ্ছে। এর নাম Fiber-Integrated Electronics। এই প্রযুক্তিতে কাপড়ের মধ্যেই ইলেকট্রনিক্স এমনভাবে যুক্ত করা হয় যে পোশাকটি শরীরের দ্বিতীয় ত্বকের (Second Skin) মতো অনুভূত হয়।
সেন্সর আর আলাদা ডিভাইস নয়, সুতোই হয়ে যাচ্ছে সেন্সর
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো, বিজ্ঞানীরা আর কাপড়ের ওপর আলাদা ডিভাইস লাগাচ্ছেন না। বরং কাপড় তৈরির সুতোকেই স্মার্ট সেন্সরে পরিণত করছেন।
এর জন্য প্রতিটি সুতোকে রূপা (Silver) বা কার্বন ন্যানোটিউব-এর মতো বিদ্যুৎ পরিবাহী পদার্থ দিয়ে আবৃত করা হয়। এরপর সেই সুতোগুলো দিয়েই কাপড় বোনা হয়।
বাইরে থেকে এটি দেখতে একেবারে সাধারণ টি-শার্টের মতো। কিন্তু অণুবীক্ষণ যন্ত্রে (মাইক্রোস্কোপে) দেখলে বোঝা যায়, প্রতিটি সুতো ছোট ছোট ইলেকট্রোড হিসেবে কাজ করছে।
এই স্মার্ট সুতো শরীরের হৃদস্পন্দনের ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক সংকেত, ঘামের আর্দ্রতা সহ নানা তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।
যেহেতু সেন্সরগুলো কাপড়ের ভেতরেই স্থায়ীভাবে বসানো থাকে, তাই এগুলো নড়াচড়া করে না। ফলে একটি ঢিলেঢালা স্মার্টওয়াচের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভুল তথ্য পাওয়া সম্ভব।

শুধু স্টেপ কাউন্ট নয়, দেবে হাসপাতাল-মানের স্বাস্থ্য তথ্য
এই প্রযুক্তি শুধু কত কদম হাঁটলেন তা গোনার জন্য নয়। এটি হাসপাতাল-মানের স্বাস্থ্যতথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম।
উদাহরণ হিসেবে –
- একজন পেশাদার ক্রীড়াবিদের দৌড়ানোর সময় পায়ের পেশির ক্লান্তি কতটা হচ্ছে, তা বৈদ্যুতিক সংকেত বিশ্লেষণ করে জানাতে পারে।
- ফিজিওথেরাপি নেওয়া কোনো রোগীর শরীরের নড়াচড়ার পরিধি (Range of Motion) কতটা উন্নত হচ্ছে, তা চিকিৎসক বাড়িতে বসেই পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। এজন্য রোগীকে বারবার হাসপাতালে যেতে হবে না।
এছাড়াও এই স্মার্ট পোশাক রিয়েল-টাইমে শরীরের তাপমাত্রা এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের ধরন পর্যবেক্ষণ করতে পারে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এতে কোনো শক্ত তার বা বড় ব্যাটারি নেই। তাই এটি পরলে মনে হবে না আপনি কোনো চিকিৎসা-যন্ত্র পরে আছেন। বরং এটি হবে একটি আরামদায়ক সাধারণ টি-শার্টের মতো।
এই মুহূর্তের ট্রেন্ডিং আর্টিকেলগুলো
এখনও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে
তবে এই প্রযুক্তি এখনও বাজারে ব্যাপকভাবে আসেনি। এর অন্যতম কারণ হলো –
- স্মার্ট সুতোকে এমনভাবে তৈরি করা কঠিন, যাতে বারবার ধোয়া ও গরম ড্রায়ারের তাপেও এটি নষ্ট না হয়।
- কাপড় ধোয়ার ডিটারজেন্টের রাসায়নিক উপাদান স্মার্ট সুতোর বিশেষ আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
- এছাড়া, এই ধরনের স্মার্ট কাপড় বড় পরিসরে উৎপাদন করা এখনও সাধারণ সুতি কাপড়ের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল।
কেন এই প্রযুক্তি এত গুরুত্বপূর্ণ?
গবেষকদের মতে, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তায় এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা বিশাল।
ধরুন একজন দমকলকর্মী বা নির্মাণশ্রমিক বিপজ্জনক পরিবেশে কাজ করছেন।
তাঁদের পোশাক যদি শরীরের অতিরিক্ত তাপমাত্রা, অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন বা অন্য কোনো বিপদের লক্ষণ শনাক্ত করতে পারে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তত্ত্বাবধায়কের কাছে সতর্কবার্তা পাঠানো যাবে। এতে দুর্ঘটনা বা স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।

ভবিষ্যতের পোশাক শুধু পরবেন না, আপনাকে রক্ষাও করবে
ফ্যাশন ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে (STEAM) এই গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো পোশাকের ওপর বড় বড় স্ক্রিন বা ভারী ডিভাইস লাগানো নয়।
বরং প্রযুক্তিকে এতটাই ছোট, নমনীয় এবং কাপড়ের সঙ্গে একীভূত করা, যাতে ব্যবহারকারী বুঝতেই না পারেন যে তিনি একটি স্মার্ট ডিভাইস পরে আছেন।
গবেষকদের বিশ্বাস, উৎপাদন প্রযুক্তি আরও উন্নত হলে ভবিষ্যতের পোশাক শুধু শরীর ঢেকে রাখবে না – আপনার স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করবে, বিপদের আগাম সতর্কবার্তা দেবে এবং প্রয়োজনে আপনার জীবন রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।








