প্রোটিন ঘাটতি শরীরকে দুর্বল করে, পেশি ক্ষয় ঘটায় এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমায়, তাই প্রতিদিন পর্যাপ্ত প্রোটিন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশে আমরা সাধারণত বলি,“খাবার তো ঠিকই খাচ্ছি।” তিন বেলা ভাত, সঙ্গে আলু ভাজি, ডাল, কখনো মাছ বা ডিম। তবু কেন এত মানুষ সবসময় ক্লান্ত থাকে, সামান্য কাজেই হাঁপিয়ে যায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে?
এর মূল কারণ অনেক সময়ই একটি – প্রোটিন ঘাটতি।
প্রোটিন আসলে কী এবং কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
প্রোটিন বা আমিষ হলো আমাদের শরীরের বিল্ডিং ব্লক। আমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গঠন ও মেরামতের জন্য প্রোটিন অপরিহার্য। শরীর নিজে থেকে প্রোটিন জমিয়ে রাখতে পারে না, তাই প্রতিদিন খাবারের মাধ্যমে এটি গ্রহণ করা জরুরি। ভাত শরীরকে শক্তি দেয়, কিন্তু প্রোটিন শরীরকে গড়ে তোলে ও সুস্থ রাখে। যেসব কারণে আমাদের শরীরে প্রোটিন দরকার:
- পেশি
- হাড়
- ত্বক
- চুল
- হরমোন
- এনজাইম
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা
সহজ করে বললে –
👉 ভাত শরীরকে জ্বালানি (ক্যালরি) দেয়।
👉 প্রোটিন শরীর গড়ে তোলে ও মেরামত করে। কিন্তু সমস্যা হলো, আমাদের খাদ্যাভ্যাসে জ্বালানি আছে, নির্মাণসামগ্রী নেই।

বাংলাদেশে প্রোটিন ঘাটতি এত সাধারণ কেন?
১। ভাত-কেন্দ্রিক খাদ্যাভ্যাস
আমাদের প্রধান খাবার ভাত। এক প্লেট ভাতে প্রচুর ক্যালরি থাকলেও প্রোটিনের পরিমাণ খুবই কম। ফলে ভাত খেলে পেট ভরে যায় এবং শরীর শক্তি পায়, কিন্তু গঠন ও মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিনের ঘাটতি থেকেই যায়। একজন মানুষ যদি দিনে তিন বেলা শুধু ভাত খেয়েই পেট ভরান, তাহলে ক্যালরির চাহিদা পূরণ হবে ঠিকই, কিন্তু শরীর ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়বে। এতে পেশি ক্ষয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদে নানা স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে।
২। “ডাল খেলেই পর্যাপ্ত প্রোটিন হয়” – এই ভুল ধারণ
“ডাল খেলেই পর্যাপ্ত প্রোটিন হয়”—এই ধারণাটি আমাদের সমাজে খুবই প্রচলিত, কিন্তু এটি পুরোপুরি সঠিক নয়। ডাল নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের উৎস, তবে আমরা সাধারণত যে পরিমাণ ডাল খাই, তা দৈনিক প্রোটিন চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ডাল থাকে খুব পাতলা এবং পরিমাণও সীমিত। তাছাড়া ডালের প্রোটিনের মান বা গুণগত দিক প্রাণিজ প্রোটিনের তুলনায় কম। তাই শুধু ডালের উপর নির্ভর করে শরীরের প্রয়োজনীয় প্রোটিন পূরণ করা প্রায় অসম্ভব।
এই মুহূর্তের ট্রেন্ডিং আর্টিকেলগুলো
৩। প্রোটিনকে বিলাসী খাবার ভাবা
অনেক পরিবারে এখনো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারকে বিলাসী হিসেবে দেখা হয়। ডিম, মাছ বা মাংসকে বিশেষ দিনের খাবার মনে করে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। ধারণা করা হয়, নিয়মিত এসব খাবার খাওয়া অপ্রয়োজনীয় বা অপচয়। বাস্তবে এটি একটি ভুল বিশ্বাস। প্রোটিন শরীরের দৈনন্দিন গঠন ও মেরামতের জন্য অপরিহার্য, ঠিক যেমন ভাত শক্তির জন্য প্রয়োজন। প্রতিদিন অল্প পরিমাণে হলেও ডিম, মাছ বা অন্যান্য প্রোটিন গ্রহণ না করলে শরীর ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং নানা স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়।
৪। বয়স বাড়লেও প্রোটিন বাড়ে না
৩০ বছর বয়সের পর থেকে শরীরে স্বাভাবিকভাবেই পেশি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে, যাকে অনেকেই গুরুত্ব দেন না। কিন্তু এই সময়ে আমাদের খাদ্যাভ্যাসে তেমন কোনো পরিবর্তন আসে না এবং প্রোটিনের পরিমাণও বাড়ানো হয় না। এর ফল হিসেবে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, কর্মক্ষমতা কমে যায় এবং সহজেই ওজন বাড়তে শুরু করে। বিশেষ করে পেটের মেদ জমে, হাঁটু ও পিঠে ব্যথা দেখা দেয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীর সুস্থ রাখতে হলে প্রোটিনের চাহিদা যে বাড়ে—এই বিষয়টি বুঝে খাবারে সচেতন পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি।

প্রোটিন ঘাটতির লক্ষণগুলো কী?
অনেকে বুঝতেই পারেন না যে সমস্যার মূল প্রোটিন। সাধারণ লক্ষণগুলো হল:
- সবসময় ক্লান্ত লাগা
- অল্প কাজেই শক্তি শেষ
- চুল পড়া
- নখ ভেঙে যাওয়া
- ঘন ঘন অসুস্থ হওয়া
- ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া
- বয়সের তুলনায় শরীর ঢিলে হয়ে যাওয়া
শিশুদের ক্ষেত্রে:
- উচ্চতা ও ওজন ঠিকমতো না বাড়া
- পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়া
একজন বাংলাদেশি প্রাপ্তবয়স্কের দৈনিক কতটুকু প্রোটিন দরকার?
সাধারণভাবে:
প্রতি কেজি ওজনের জন্য ০.৮–১ গ্রাম প্রোটিন
যারা একটু সক্রিয় বা বয়স ৪০-এর বেশি, তাদের জন্য ১–১.২ গ্রাম
উদাহরণ:
৬০ কেজি ওজনের মানুষের জন্য দিনে প্রায় ৫০–৬০ গ্রাম প্রোটিন দরকার।
এখন প্রশ্ন, আমরা কি সত্যিই এতটা পাচ্ছি?
না, বেশিরভাগ মানুষই পাচ্ছেন না।
সহজ ও সাশ্রয়ী প্রোটিনের উৎস (বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে)
ডিম
ডিম হলো সবচেয়ে সস্তা ও সহজলভ্য সম্পূর্ণ প্রোটিনের উৎস। এতে শরীরের প্রয়োজনীয় প্রায় সব অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে, যা পেশি গঠন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। দিনে ১–২টি ডিম নিয়মিত খেলে শক্তি বাড়ে, দীর্ঘ সময় পেট ভরা থাকে এবং সার্বিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে।
মাছ
মাছ আমাদের দেশের একটি উৎকৃষ্ট ও সহজলভ্য প্রোটিন উৎস। রুই, কাতলা, তেলাপিয়া কিংবা পুঁটি – সব মাছেই ভালো মানের প্রোটিনের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ফ্যাট ও খনিজ উপাদান থাকে। নিয়মিত মাছ খেলে পেশি শক্ত হয়, হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। তাই সপ্তাহে অন্তত ৪–৫ দিন মাছ রাখা উচিত।

দুধ ও দই
দুধ ও দই বয়স্কদের জন্য খুবই উপকারী প্রোটিনের উৎস। এতে থাকা ক্যালসিয়াম হাড় মজবুত করে এবং প্রোটিন পেশি দুর্বল হওয়া রোধ করে। দইয়ে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়া অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে, হজমশক্তি বাড়ায় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সাহায্য করে।
ডাল ও ছোলা
ডাল ও ছোলা হলো সবচেয়ে সহজলভ্য উদ্ভিজ্জ প্রোটিন উৎস। যদিও এদের প্রোটিনের মান প্রাণিজ প্রোটিনের চেয়ে কিছুটা কম, তবু এগুলোকে ডিম, মাছ বা দুধের মতো প্রাণিজ প্রোটিনের সঙ্গে মিলিয়ে খেলে শরীরের জন্য সম্পূর্ণ প্রোটিন পাওয়া যায়। নিয়মিত এই সংমিশ্রণ পেশি গঠন ও শক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
বাদাম ও বীজ
বাদাম ও বীজ যেমন চিনাবাদাম, তিল, কুমড়ার বীজ—শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এগুলোতে প্রোটিনের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান থাকে, যা পেশি শক্ত রাখে, হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। অল্প পরিমাণ হলেও নিয়মিত খাওয়া শরীরের দীর্ঘমেয়াদী সুস্থতার জন্য জরুরি।
কীভাবে প্রতিদিনের খাবারে প্রোটিন বাড়াবেন?
কিছু বাস্তব টিপস:
- সকালের নাস্তায় রুটির সাথে ডিম যোগ করুন
- ভাতের প্লেট ছোট করে মাছ/ডাল বাড়ান
- বিকেলে বিস্কুটের বদলে ভাজা ছোলা বা ডিম
- রাতে ভাত কম, প্রোটিন বেশি
মনে রাখবেন, কম খাওয়া সমাধান না; সঠিক জিনিস খাওয়াই সমাধান।
প্রোটিন ঘাটতি ও ওজন বাড়ার সম্পর্ক
অনেকে অবাক হয়ে বলেন, “আমি তো কম খাই, তবু মোটা হচ্ছি কেন?”
এর কারণ:
- প্রোটিন কম, ফলে পেশি কমে
- পেশি কম, ফলে মেটাবলিজম কমে
- মেটাবলিজম কম, ফলে চর্বি জমে
পর্যাপ্ত প্রোটিন পেলে:
- ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে থাকে
- পেটের মেদ কমে
- শরীর শক্ত হয়

শেষ কথা
শেষ কথা বলতে গেলে, বাংলাদেশে আজকের বড় সমস্যা খাবারের অভাব নয়, বরং সঠিক এবং পুষ্টিকর খাবারের অভাব, যার মধ্যে প্রোটিন ঘাটতি অন্যতম। আমাদের খাদ্যাভ্যাসে ভাত প্রধান, যা শরীরকে ক্যালরি দেয় এবং ক্ষুধা মেটায়, কিন্তু পেশি গঠন ও স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিনের পরিমাণ কম থাকে। দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে দুর্বলতা, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া, ওজন বাড়া এবং শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। তাই ভাত আমাদের সংস্কৃতির অংশ হলেও, প্রোটিন হল আমাদের শক্তি, এবং প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় এটি অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।
ভাত আমাদের সংস্কৃতি, কিন্তু প্রোটিন আমাদের শক্তি।
এই দুটোর ভারসাম্য না থাকলে –
- অসুখ বাড়বে
- কর্মক্ষমতা কমবে
- বয়স দ্রুত ধরা পড়বে
আজ থেকেই প্লেটে একটু প্রোটিন বাড়ান; শরীর নিজেই পার্থক্য বুঝিয়ে দেবে।
তথ্যসূত্র
Richmond, Christine (2024). Signs You’re Not Getting Enough Protein. WebMD. https://www.webmd.com/diet/ss/slideshow-not-enough-protein-signs
Staff writer. (2024). Low Protein in Blood (Hypoproteinemia). Cleveland Clinic. https://my.clevelandclinic.org/health/diseases/low-protein-in-blood-hypoproteinemia
Arnarson, Atli, BSc, PhD. (2024). 8 Signs and Symptoms of Protein Deficiency. Healthline. https://www.healthline.com/nutrition/protein-deficiency-symptoms
Staff writer. (2025). 8 Signs of Protein Deficiency in Older Adults. National Council on Aging. https://www.ncoa.org/article/8-signs-of-protein-deficiency-in-older-adults/








