আমরা প্রায়ই কাজের চাপে, মোবাইল বা টিভি দেখার নেশায়, কিংবা নানা কারণে যথেষ্ট ঘুম দিতে পারি না। কিন্তু ঘুম কোনো বিলাসিতা নয় – এটি শরীর ও মস্তিষ্কের জন্য একেবারেই অপরিহার্য। ডাক্তাররা সাধারণত একজন প্রাপ্তবয়স্কের জন্য দৈনিক ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমের পরামর্শ দেন। অনিদ্রার প্রভাব প্রথমে হালকা মনে হলেও ধীরে ধীরে তা শরীর ও মনের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। আসুন দেখে নেওয়া যাক –
অল্প ঘুম শরীর ও মস্তিষ্কের উপর কী প্রভাব ফেলে?
১. মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা কমে যায়
ঘুম আমাদের মস্তিষ্ককে রিচার্জ করার কাজ করে। যখন আমরা যথেষ্ট ঘুমাই না, তখন মস্তিষ্ক ঠিকভাবে তথ্য প্রক্রিয়াজাত করতে পারে না। এর ফলে –
- মনোযোগের ঘাটতি দেখা দেয়।
- সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়।
- স্মৃতিশক্তি কমে যায়, বিশেষ করে স্বল্পমেয়াদি স্মৃতি।
- সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা রাতে ৫ ঘণ্টার কম ঘুমায়, তাদের ভুল করার সম্ভাবনা প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে যায়। অর্থাৎ, অপর্যাপ্ত ঘুম সরাসরি আমাদের শেখার ক্ষমতা এবং কাজের দক্ষতার উপর প্রভাব ফেলে।
২. মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি
অল্প ঘুম মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও বিরূপ প্রভাব ফেলে। ঘুমের অভাব মস্তিষ্কে সেরোটোনিন ও ডোপামিনের ভারসাম্য নষ্ট করে, যা আমাদের মুড বা আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে। এর ফলাফল হলো:
- অকারণে রাগ বা খিটখিটে মেজাজ।
- উদ্বেগ বাড়া।
- হতাশা তৈরি হওয়া বা বৃদ্ধি পাওয়া।
- মানসিক চাপ মোকাবিলার ক্ষমতা কমে যাওয়া।
ক্লিনিক্যাল সাইকোলজির গবেষণা বলছে, যাদের অনিদ্রার সমস্যা আছে, তাদের মধ্যে ডিপ্রেশন হওয়ার ঝুঁকি দ্বিগুণ বেশি।

৩. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে
যখন আমরা ঘুমাই, তখন শরীর সাইটোকাইন নামের প্রোটিন তৈরি করে, যা সংক্রমণ ও প্রদাহ প্রতিরোধে সাহায্য করে। অল্প ঘুমের কারণে সাইটোকাইনের উৎপাদন কমে যায়। এর ফলে –
- সহজেই ঠান্ডা-কাশি বা ফ্লু হয়।
- ক্ষত বা আঘাত সারতে সময় বেশি লাগে।
- দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারসহ জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
সোজা কথায়, অল্প ঘুম মানে শরীরের ডিফেন্স সিস্টেম দুর্বল হয়ে পড়া।
৪. হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি
যারা কম ঘুমায়, তাদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেক বেশি। কারণ ঘুম শরীরের রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন নিয়ন্ত্রণে রাখে। যথেষ্ট ঘুম না হলে –
- রক্তচাপ বেড়ে যায়।
- ধমনীর দেয়ালে চাপ পড়ে।
- হৃদপিণ্ড অতিরিক্ত কাজ করতে বাধ্য হয়।
হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, দীর্ঘদিন কম ঘুমানো হৃদরোগের অন্যতম প্রধান কারণ।
এই মুহূর্তের ট্রেন্ডিং আর্টিকেলগুলো
৫. হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়
অল্প ঘুম শরীরে হরমোনের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত করে। যেমন –
- ঘ্রেলিন (Ghrelin) হরমোন বেড়ে যায়, যা ক্ষুধা বাড়ায়।
- লেপ্টিন (Leptin) হরমোন কমে যায়, যা ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করে।
- ফলে, যারা কম ঘুমায় তাদের মধ্যে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয় এবং ওজন বেড়ে যায়।
- এছাড়া অনিদ্রা ইনসুলিন হরমোনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়, ফলে ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
৬. ত্বক ও সৌন্দর্যের উপর প্রভাব
“বিউটি স্লিপ” কথাটা শুধু কথার কথা নয়। ঘুমের সময় শরীর কোলাজেন উৎপাদন করে, যা ত্বককে টানটান ও উজ্জ্বল রাখে। অল্প ঘুমের কারণে –
- চোখের নিচে কালো দাগ হয়।
- ত্বক শুষ্ক ও রুক্ষ হয়ে যায়।
- অল্প বয়সে বলিরেখা পড়তে শুরু করে।
- চুল ভাঙা ও ঝরে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে।
অতএব, ভালো দেখাতে চাইলে রাত জাগা কমাতে হবে।

৭. শারীরিক শক্তি ও সহনশীলতা কমে যায়
ঘুম শরীরকে পুনরুজ্জীবিত করে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে –
- শরীরে এনার্জি কমে যায়।
- ক্লান্তি ও দুর্বলতা দেখা দেয়।
- ব্যায়াম বা কাজ করার সময় দ্রুত ক্লান্ত লাগে।
- পেশী পুনর্গঠন ও বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।
ক্রীড়াবিদরা তাই নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম দেন, কারণ এটি তাদের পারফরম্যান্স বাড়ায়।
৮. দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে
অল্প ঘুমের কারণে মনোযোগ কমে যায়, রিঅ্যাকশন টাইম ধীর হয়ে যায়। এর ফলে –
- গাড়ি চালানোর সময় ঘুমিয়ে পড়া।
- কাজের সময় যন্ত্রপাতি ব্যবহারে ভুল করা।
- হঠাৎ ভারসাম্য হারানো।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রতি বছর হাজারো সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে অনিদ্রা অন্যতম কারণ।
৯. দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা
ঘুমের অভাব যদি অভ্যাসে পরিণত হয়, তবে এটি একাধিক দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। যেমন –
- ডায়াবেটিস
- স্থূলতা
- হৃদরোগ
- অ্যালঝাইমার ও ডিমেনশিয়া
- ক্যান্সার
অর্থাৎ, অল্প ঘুম শুধু সাময়িক ক্ষতি করে না, বরং ভবিষ্যতের জন্যও বিপজ্জনক।
ঘুমের মান উন্নত করার উপায়
- প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও উঠা।
- ঘুমানোর আগে মোবাইল, টিভি বা কম্পিউটার এড়িয়ে চলা।
- ক্যাফিন ও ভারী খাবার ঘুমের আগে না খাওয়া।
- শান্ত ও অন্ধকার পরিবেশে ঘুমানো।
- ব্যায়াম করা, তবে ঘুমানোর আগে নয়।

উপসংহার
ঘুম শরীর ও মস্তিষ্কের জন্য জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। অল্প ঘুম মানে শরীরকে অর্ধেক খালি ট্যাংক নিয়ে চলতে বাধ্য করা। এর ফল কখনোই ভালো হয় না। তাই সুস্থ, কর্মক্ষম ও সুখী থাকতে চাইলে ঘুমকে প্রাধান্য দিতে হবে। মনে রাখবেন, স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার তিনটি মূল স্তম্ভ হলো – সুষম খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত ঘুম। এর মধ্যে কোনো একটি উপেক্ষা করলে বাকি দুটি যথেষ্ট হলেও পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে না।
❓ অল্প ঘুম নিয়ে সাধারণ কিছু প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১: একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কত ঘণ্টা ঘুমানো দরকার?
উত্তর ১: সাধারণত একজন প্রাপ্তবয়স্কের জন্য দৈনিক ৭–৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। তবে ব্যক্তিভেদে সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে।
প্রশ্ন ২: পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরের প্রথম লক্ষণগুলো কীভাবে বোঝা যায়?
উত্তর ২: প্রথমে চোখে ঝাপসা দেখা, মনোযোগ কমে যাওয়া, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, মাথাব্যথা এবং ক্লান্তি দিয়ে বোঝা যায়।
প্রশ্ন ৩: অনিদ্রা কি ওজন বাড়ায়?
উত্তর ৩: হ্যাঁ। ঘুমের অভাবে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়, ফলে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয় এবং ওজন বেড়ে যায়।
প্রশ্ন ৪: অল্প ঘুম মানসিক স্বাস্থ্যের উপর কী প্রভাব ফেলে?
উত্তর ৪: ঘুম পর্যাপ্ত না হলে তা উদ্বেগ (Anxiety), হতাশা (Depression) ও অতিরিক্ত মানসিক চাপ বাড়ায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি মানসিক রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
প্রশ্ন ৫: অনিদ্রা কি সত্যিই হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়?
উত্তর ৫: হ্যাঁ। ঘুমের অভাবে রক্তচাপ বেড়ে যায় এবং হৃদপিণ্ডের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।
প্রশ্ন ৬: ঘুমের মান বাড়াতে কী করা যেতে পারে?
উত্তর ৬:
- প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো ও জাগা
- ঘুমানোর আগে মোবাইল/টিভি এড়ানো
- শান্ত ও অন্ধকার ঘরে ঘুমানো
- নিয়মিত ব্যায়াম করা
- ঘুমানোর আগে ক্যাফেইন ও ভারী খাবার এড়ানো

প্রশ্ন ৭: দিনে ঘুম (Nap) কি অল্প রাতের ঘুম পূরণ করতে পারে?
উত্তর ৭: দিনের ছোট্ট ঘুম (২০–৩০ মিনিট) কিছুটা সাহায্য করে, তবে এটি কখনোই রাতের পূর্ণাঙ্গ ঘুমের বিকল্প নয়।
প্রশ্ন ৮: অনিদ্রা কি স্থায়ীভাবে মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে?
উত্তর ৮: অল্প সময়ের ঘুমের ঘাটতি সাময়িক সমস্যা তৈরি করে। তবে দীর্ঘমেয়াদি ঘুমের অভাবে মস্তিষ্কে স্মৃতিভ্রংশ, ডিমেনশিয়া বা অ্যালঝাইমারের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
শেষ কথা
অল্প ঘুম শরীর ও মস্তিষ্কের জন্য নিঃশব্দ শত্রু। এটি মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমায়, একই সঙ্গে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও মানসিক চাপের ঝুঁকি বাড়ায়। পর্যাপ্ত ঘুমই শরীরের পুনরুজ্জীবন ও মানসিক ভারসাম্যের চাবিকাঠি। তাই ভালো ঘুম মানে শুধু বিশ্রাম নয় – এটা দীর্ঘায়ু ও সুস্থ জীবনের অন্যতম রহস্য।
Sources:
NIH. (2022). What Are Sleep Deprivation and Deficiency? National Heart, Lung, and Blood Institute. https://www.nhlbi.nih.gov/health/sleep-deprivation
Cleveland Clinic. (2022). Sleep Deprivation. https://my.clevelandclinic.org/health/diseases/23970-sleep-deprivation
Health Infographic. (2024). The Effects of Sleep Deprivation. Johns Hopkins Medicine. https://www.hopkinsmedicine.org/health/wellness-and-prevention/the-effects-of-sleep-deprivation








