ভাজা আলু অস্বাস্থ্যকর কারণ এতে অতিরিক্ত তেল ও অ্যাক্রিলামাইড থাকে, যা হৃদযন্ত্রের ক্ষতি করে, ওজন বাড়ায়, ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে শরীর দুর্বল করে এবং স্বাস্থ্যহানি।
মচমচে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, মুচমুচে পটেটো চিপস কিংবা কড়াইয়ে লাল করে ভাজা আলু – আমাদের খাদ্যতালিকায় আলুর জনপ্রিয়তা নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই প্রিয় ভাজা খাবারটি আপনার শরীরে নিঃশব্দে বিষ প্রবেশ করাচ্ছে?
আমি একজন পুষ্টিবিদ হিসেবে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের ডায়েট চার্ট তৈরি করি। সেখানে যখন কেউ আলু ভাজার কথা উল্লেখ করেন, তখন আমাকে বারবার সতর্ক করতে হয়। কারণ, উচ্চতাপে আলু ভাজলে সেখানে Acrylamide (অ্যাক্রাইলামাইড) নামক একটি রাসায়নিক উপাদান তৈরি হয়, যা সরাসরি ক্যান্সারের ঝুঁকির সাথে যুক্ত।
আজকের এই বিস্তারিত নিবন্ধে আমি আপনাদের জানাব কেন আলু ভাজা পরিহার করা উচিত এবং কীভাবে আলু খেলে আপনি এর সর্বোচ্চ পুষ্টিগুণ পাবেন।
অ্যাক্রাইলামাইড কী এবং এটি কীভাবে তৈরি হয়?
অ্যাক্রাইলামাইড কোনো কৃত্রিম উপাদান নয় যা বাইরে থেকে মেশানো হয়। এটি একটি প্রাকৃতিক রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফল। যখন স্টার্চ বা শর্করা জাতীয় খাবার (যেমন আলু) উচ্চ তাপমাত্রায় (১২০° সেলসিয়াসের উপরে) ভাজা, রোস্ট বা বেক করা হয়, তখন আলুর ভেতরে থাকা প্রাকৃতিক চিনি এবং Asparagine নামক অ্যামিনো অ্যাসিডের মধ্যে একটি বিক্রিয়া ঘটে। একে বলা হয় মাইয়ার্ড রিয়েকশান (Maillard Reaction)।
এই বিক্রিয়ার কারণেই ভাজা খাবারের রং বাদামী বা লালচে হয় এবং একটি সুন্দর ঘ্রাণ তৈরি হয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার উপজাত হিসেবেই তৈরি হয় অ্যাক্রাইলামাইড।
👉 গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: আলু সিদ্ধ বা সেদ্ধ/বয়লে রান্না করলে acrylamide প্রায় তৈরি হয় না, কারণ এটি উচ্চ তাপমাত্রায় শুকনো পরিবেশে (জল কম থাকলে) সৃষ্টি হয়।
গবেষণার তথ্য ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি
১. ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার (IARC)
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই অঙ্গপ্রতিষ্ঠানটি অ্যাক্রাইলামাইডকে “Group 2A carcinogen” হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। এর অর্থ হলো, এটি মানুষের শরীরে ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে বলে জোরালো প্রমাণ রয়েছে।
২. ইউরোপীয় খাদ্য সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ (EFSA)
২০১৫ সালে তাদের একটি বিস্তৃত গবেষণায় দেখা গেছে যে, খাদ্যতালিকায় থাকা অ্যাক্রাইলামাইড সব বয়সের মানুষের জন্য ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব অনেক বেশি।
৩. প্রাণীজ গবেষণা
বিভিন্ন ল্যাবরেটরি গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চমাত্রায় অ্যাক্রাইলামাইড সেবনে ইঁদুর এবং অন্যান্য প্রাণীর শরীরে টিউমার ও ডিএনএ ড্যামেজ হওয়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
হাভার্ড এবং অন্যান্য বৃহৎ পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় দেখা গেছে যে খাবার থেকে acrylamide খাওয়ার পরিমাণ এবং স্তন ক্যান্সার, মলাশয়/কিডনি ক্যান্সার ইত্যাদির ঝুঁকির মধ্যে কার্যত কোনো শক্তিশালী সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।

আন্তর্জাতিক অনুমান
যদিও ইউএস FDA এবং WHO-এর এক্সপার্ট কমিটি মনে করে যে এটা মানব স্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে, তবুও বিভিন্ন মানুষের পর্যবেক্ষণ-ভিত্তিক গবেষণায় সরাসরি ঝুঁকি নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন।
অর্থাৎ – প্রাণীর উপর গবেষণায় ঝুঁকি দেখায়, কিন্তু মানুষের উপর পর্যাপ্ত ও যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ এখনও পরিষ্কারভাবে নেই।
এই মুহূর্তের ট্রেন্ডিং আর্টিকেলগুলো
কেন ভাজা আলু অস্বাস্থ্যকর?
আলু হলো উচ্চ শর্করা সমৃদ্ধ খাবার। যখন আমরা আলু ডুবো তেলে ভাজি (Deep Fry), তখন আলুর উপরিভাগের তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যায়। ফলে সেখানে প্রচুর পরিমাণে অ্যাক্রাইলামাইড জমা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই এবং চিপসে এই রাসায়নিকের উপস্থিতি সবথেকে বেশি থাকে।
যত বেশি সময় ধরে আলু ভাজা হবে এবং আলুর রং যত বেশি গাঢ় বাদামী হবে, অ্যাক্রাইলামাইডের মাত্রা ততটাই বাড়বে।
রঙের সম্পৃক্ততা
যত বেশি বাদামি/গাঢ় রং, তত বেশি acrylamide তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা। তাই cooking guideline-এ প্রস্তাব থাকে সোনালি হলুদ রঙে রান্না করুন, খুব গাঢ় করে না।
মানুষের দেহে কী ঘটে?
যখন এক্রিলামাইড শরীরে প্রবেশ করে:
- তা হজম হয়ে গ্লাইসিডামাইড নামক এক যৌগে রূপান্তরিত হতে পারে। এই যৌগটি কিছু ক্ষেত্রে ডিএনএ-তে ক্ষতি করতে পারে।
- কিন্তু মানুষের শরীরে মোট এক্রিলামাইডের পরিমাণ খুব কম থাকে, তাই দীর্ঘ মেয়াদে এর প্রভাব আলোচনা-যোগ্য অংশ।

আরও ঝুঁকি কী আছে?
যেহেতু বেশিরভাগ গবেষণা পর্যবেক্ষণ পর্যায়ের, তাই কিছু অংশে দেখা গেছে:
অতিরিক্ত ভাজা বা তেল-ভিত্তিক খাবার খাওয়ার কারণে ওজন বাড়া, হৃৎপিণ্ডের ঝুঁকি, মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা ইত্যাদি হতে পারে – কিন্তু এগুলো সরাসরি acrylamide-এর কারণে নয়, বরং উচ্চ ক্যালোরি, ট্রান্স ফ্যাট ইত্যাদি কারণে
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে ভাজা আলু বেশি খেলে আপনার শরীরের প্রদাহ/অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বাড়তে পারে, যা কিছু অসুখ-ব্যাধির ঝুঁকি বাড়ায়। এই দিকেও সবসময় নজর রাখা ভালো।
সুস্থ থাকতে আলু খাওয়ার সঠিক পদ্ধতি
আলু নিজেই ক্ষতিকর নয়; ক্ষতির কারণ হলো রান্নার পদ্ধতি। আলু ভিটামিন সি, পটাশিয়াম এবং ফাইবার সমৃদ্ধ একটি সবজি। এর পুষ্টিগুণ বজায় রেখে খাওয়ার দুটি সেরা পদ্ধতি হলো:
১. সেদ্ধ করা
আলু সেদ্ধ করলে পানির তাপমাত্রা ১০০° সেলসিয়াসের উপরে যায় না। ফলে অ্যাক্রাইলামাইড তৈরি হওয়ার কোনো সুযোগই থাকে না। সেদ্ধ আলু ম্যাশ করে বা তরকারিতে দিয়ে খাওয়া সবথেকে নিরাপদ।
২. বেক করা
যদি আপনার ভাজা খাবারের স্বাদ পেতে ইচ্ছা হয়, তবে আলু পাতলা করে কেটে ওভেনে বেক করতে পারেন। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন তা পুড়ে না যায় বা অতিরিক্ত বাদামী না হয়। সোনালী বর্ণ হওয়ার আগেই নামিয়ে ফেললে অ্যাক্রাইলামাইডের ঝুঁকি অনেকটা কম থাকে।
ঝুঁকি কমানোর কিছু কার্যকর টিপস
যদি মাঝে মাঝে আলু ভাজা খেতেই হয়, তবে একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমার এই পরামর্শগুলো মেনে চলতে পারেন:
- ফ্রিজে আলু রাখবেন না: আলু ফ্রিজে রাখলে এর চিনি বা শর্করার পরিমাণ বেড়ে যায়, যা রান্নার সময় বেশি অ্যাক্রাইলামাইড তৈরি করে। আলু সবসময় অন্ধকার ও ঠান্ডা জায়গায় (ফ্রিজের বাইরে) রাখুন।
- ভেজানোর পদ্ধতি: কাঁচা আলু কাটার পর ১৫-৩০ মিনিট পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। এতে আলুর উপরিভাগের অতিরিক্ত চিনি ধুয়ে যায়, ফলে ভাজার সময় ক্ষতিকর কেমিক্যাল কম তৈরি হয়।
- রঙের দিকে খেয়াল রাখুন: আলু ভাজার সময় যখন তা হালকা সোনালী হবে তখনই নামিয়ে ফেলুন। বেশি লাল বা কালো করবেন না।

উপসংহার
খাবার কেবল পেট ভরার জন্য নয়, এটি শরীরের জ্বালানি। আর সেই জ্বালানি যদি ভেজাল বা ক্ষতিকর হয়, তবে শরীর দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত হবেই। ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধি থেকে দূরে থাকতে আমাদের খাদ্যাভ্যাসে ছোট ছোট পরিবর্তন আনা জরুরি। মনে রাখবেন ভাজা আলু অস্বাস্থ্যকর। তাই ফ্রেঞ্চ ফ্রাই চিপস পরিহার করে সেদ্ধ বা স্বাস্থ্যকর উপায়ে রান্না করা আলু খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
সুস্থ থাকুন, সচেতন থাকুন।
সারসংক্ষেপ
✔️ এক্রিলামাইড তৈরি হয় উচ্চ তাপ + স্টার্চযুক্ত খাবার (যেমন ভাজা আলু) থেকে।
✔️ প্রাণীর উপর গবেষণায় ক্যান্সার ঝুঁকি দেখা গেছে।
✔️ মানুষের উপর অভ্যন্তরীণ প্রমাণ স্পষ্ট নয় – কিছু গবেষণা ঝুঁকি দেখায় না।
✔️ তবুও আন্তর্জাতিক কমিটিগুলো একে মানব স্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হিসেবে বিবেচনা করে।
✔️ বয়েল/সেদ্ধ/স্টিম করা খাবারে acrylamide অত্যন্ত কম বা নেই।
👉 অর্থাৎ: দ্রুত সিদ্ধান্ত ভাজা খাবার বন্ধ নয়, বরং বিবেকসম্মত ও স্বাস্থ্য-সম্মত রান্নার পদ্ধতি অনুসরণ করা – বিশেষত যাঁদের ঝুঁকি বেশি (যেমন ক্যান্সারের পূর্ব ইতিহাস, ধূমপায়ী, জন্মগত ঝুঁকি ইত্যাদি) – তাদের জন্য এটা যুক্তিযুক্ত উপদেশ।
তথ্যসূত্র
Staff writer. (2025). Acrylamide. USFDA. https://www.fda.gov/food/process-contaminants-food/acrylamide?utm
Staff writer. (2024). Acrylamide Questions and Answers. USFDA. https://www.fda.gov/food/process-contaminants-food/acrylamide-questions-and-answers?
Staff writer. (2005). Study Shows Acrylamide In Baked And Fried Foods Does Not Increase Risk Of Breast Cancer In Women. Science Daily. https://www.sciencedaily.com/releases/2005/03/050323134055.htm?utm
Staff writer. (2017). Acrylamide and Cancer Risk. National Cancer Institute. https://www.cancer.gov/about-cancer/causes-prevention/risk/diet/acrylamide-fact-sheet?
Pieternel A Luning, Maimunah Sanny. (2016). Acrylamide in Fried Potato Products. ResearchGate. https://www.researchgate.net/publication/281719612_Acrylamide_in_Fried_Potato_Products








