Home অসুখ-বিসুখ ফ্যাটি লিভার কেন হয় এবং এটা নিরাময়ের উপায়

ফ্যাটি লিভার কেন হয় এবং এটা নিরাময়ের উপায়

311
0

ফ্যাটি লিভার কেন হয়, তা বুঝতে হলে আমাদের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের ভুলগুলো চিহ্নিত করা জরুরি।

আজকাল অনেকেই শুনে থাকেন “আপনার লিভারে চর্বি জমেছে” বা “ফ্যাটি লিভার আছে” – ডাক্তারি ভাষায় যাকে বলে Fatty Liver বা হেপাটিক স্টিটোসিস (Hepatic Steatosis)। কিন্তু এই রোগ আসলে কী, কেন হয়, আর কীভাবে মুক্তি পাওয়া যায় – সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর অনেকেরই জানা থাকে না।

চলুন আজ একবারে বুঝে নেওয়া যাক – সহজ ভাষায়, যেন আপনি যেমন বাজারে আলু কিনতে পারেন, তেমনি এই রোগের তথ্যও আত্মস্থ করতে পারেন!

ফ্যাটি লিভার আসলে কী?

লিভার আমাদের শরীরের সবচেয়ে ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর একটি। এটি দেহ থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেয়, শক্তি সংরক্ষণ করে, হজমে সহায়তা করে এবং আরও শতাধিক কাজ করে।

কিন্তু যখন লিভারে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি চর্বি (Fat) জমে, তখন তাকে বলে ফ্যাটি লিভার। যদি এই চর্বির পরিমাণ লিভারের মোট ওজনের ৫%-এর বেশি হয়, তখন বিষয়টি চিন্তার।

ফ্যাটি লিভারের দুইটি ধরণ:

১. Non-Alcoholic Fatty Liver Disease (NAFLD) – অ্যালকোহল না খেয়েও লিভারে চর্বি জমা।

২. Alcoholic Fatty Liver Disease (AFLD) – অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবনের ফলে লিভারে চর্বি জমা

এই আর্টিকেলে আমরা মূলত NAFLD নিয়েই আলোচনা করবো, যেটি বাংলাদেশে এখন মহামারি রূপে দেখা দিচ্ছে ।

ফ্যাটি লিভার কেন হয়?

ফ্যাটি লিভার হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। সাধারণভাবে এগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা যায় – জীবনযাপনভিত্তিক ও চিকিৎসাবিজ্ঞানভিত্তিক। জীবনযাপনভিত্তিক কারণের মধ্যে অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অতিরিক্ত ওজন ও অ্যালকোহল গ্রহণ অন্যতম। চিকিৎসাবিজ্ঞানভিত্তিক কারণের মধ্যে ডায়াবেটিস, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, হরমোনজনিত সমস্যা ও কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত।

১। খাদ্যাভ্যাস

  • অতিরিক্ত চর্বি ও তেলযুক্ত খাবার, যেমন: ভাজাপোড়া, ফাস্টফুড
  • বেশি চিনি ও মিষ্টি জাতীয় খাবার খাওয়া
  • সফট ড্রিংকস ও কৃত্রিম মিষ্টিজাতীয় পানীয়

২। শরীরচর্চার অভাব

ফ্যাটি লিভার হওয়ার একটি বড় কারণ হলো শরীরচর্চার অভাব। দিনের অধিকাংশ সময় বসে কাজ করা, নিয়মিত হাঁটাহাঁটি বা ব্যায়াম না করলে শরীরের অতিরিক্ত ক্যালরি ও চর্বি পোড়ানো হয় না। ফলে সেই চর্বি যকৃতে জমতে শুরু করে। দীর্ঘদিন শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়ায়, মেটাবলিজম ধীর করে এবং ধীরে ধীরে ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।

৩। ওজন ও স্থূলতা

ফ্যাটি লিভার হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা। শরীরে যখন অতিরিক্ত চর্বি জমে, তখন তা শুধু ত্বকের নিচেই নয়, যকৃতের ভেতরেও জমা হতে থাকে। স্থূলতার কারণে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়, ফলে লিভার স্বাভাবিকভাবে ফ্যাট প্রসেস করতে পারে না এবং ধীরে ধীরে ফ্যাটি লিভার তৈরি হয়।

৪। ডায়াবেটিস ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স

ফ্যাটি লিভার হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো ডায়াবেটিস ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স। বিশেষ করে টাইপ ২ ডায়াবেটিসে ইনসুলিন ঠিকভাবে কাজ না করায় রক্তে অতিরিক্ত চিনি ফ্যাটে রূপান্তরিত হয়। এই ফ্যাট যকৃতে জমতে থাকে। দীর্ঘদিন ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স থাকলে লিভারের কার্যক্ষমতা কমে যায় এবং ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

৫। ওষুধ সেবন

ফ্যাটি লিভার হওয়ার আরেকটি কারণ হলো দীর্ঘদিন কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ সেবন। স্টেরয়েড, কিছু পেইন কিলার বা হরমোনজাতীয় ওষুধ দীর্ঘসময় ব্যবহার করলে যকৃতের স্বাভাবিক ফ্যাট মেটাবলিজম ব্যাহত হয়। ফলে যকৃতে অতিরিক্ত চর্বি জমতে শুরু করে এবং সময়ের সঙ্গে ফ্যাটি লিভার হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

ফ্যাটি লিভারের লক্ষণগুলো কী?

শুরুর দিকে এই রোগের কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে। তবে রোগ বাড়লে দেখা দিতে পারে –

  • হালকা ব্যথা বা অস্বস্তি পেটের ডান পাশে (লিভার অংশে)
  • অবসাদ ও দুর্বলতা
  • বমি বমি ভাব
  • খাদ্যে অরুচি
  • ওজন হ্রাস

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: অনেক সময় এই রোগ নীরবে (Silent) শরীরে বিস্তার করে এবং একসময় লিভার সিরোসিস বা ক্যান্সারেও রূপ নিতে পারে।

ফ্যাটি লিভার নির্ণয়ের উপায়

ডাক্তার সাধারণত নিচের পরীক্ষা দিয়ে ফ্যাটি লিভার নির্ণয় করেন –

  • আলট্রাসোনোগ্রাফি (Ultrasound): সবচেয়ে সহজ ও জনপ্রিয় পদ্ধতি
  • লিভার ফাংশন টেস্ট (LFT): রক্তের মাধ্যমে লিভারের কার্যকারিতা বোঝা যায়
  • CT scan/MRI: উন্নত বিশ্লেষণের জন্য
  • লিভার বায়োপসি: খুব জটিল বা সন্দেহজনক ক্ষেত্রে

ফ্যাটি লিভার কি নিরাময়যোগ্য?

ভাগ্য ভালো, এই রোগের শুরুর ধাপে কোনো ওষুধ ছাড়াই নিরাময় সম্ভব! জীবনযাপনে পরিবর্তন আনলেই লিভার আবার আগের মতো সুস্থ হয়ে উঠতে পারে।

চলুন জেনে নিই নিরাময়ের ৮টি কার্যকর উপায়:

১. ওজন কমানো

সুস্থ উপায়ে ধীরে ধীরে ওজন কমানোই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা। মাত্র ৭-১০% ওজন কমালেই লিভারে চর্বি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

২. খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনুন

  • সবজি, ফলমূল, শস্য ও বাদাম বেশি খান
  • লাল মাংস, তেলেভাজা, মিষ্টি ও চিনি কমিয়ে দিন
  • জলপাই তেল বা নারকেল তেল ব্যবহার করুন
  • প্রতিদিন ২-৩ লিটার পানি পান করুন

৩. নিয়মিত ব্যায়াম

প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা, সাইক্লিং বা যোগব্যায়াম ফ্যাটি লিভার কমাতে দারুণ কাজ করে।

৪. মদ্যপান থেকে দূরে থাকুন

যদিও আপনি NAFLD রোগী, তবুও অ্যালকোহল পুরোপুরি পরিহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

৫. নিয়মিত ঘুম

রাতের ঘুমের সময় কম হলে শরীরে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়ে, যা ফ্যাটি লিভারের কারণ হতে পারে।

৬. ওষুধ সতর্কতায় গ্রহণ করুন

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ খাবেন না, বিশেষ করে পেইন কিলার বা স্টেরয়েড।

৭. প্রাকৃতিক উপাদান খান

গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু খাবার লিভার ডিটক্স করতে সাহায্য করে, যেমন:

  • আখরোট
  • খেজুর
  • গ্রিন টি
  • লেবু পানি
  • বিটরুট

এই খাবারগুলো নিয়মিত খেলে লিভার আরও ভালো কাজ করে।

৮. মানসিক চাপ কমান

স্ট্রেস হরমোন লিভারে চর্বি জমাতে ভূমিকা রাখে। মেডিটেশন, গান শোনা বা হালকা হাঁটাহাঁটি করতে পারেন।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

যদি আপনি দীর্ঘদিন:

  • পেটের ডান পাশে ব্যথা অনুভব করেন
  • ক্লান্তি বা দুর্বলতা অনুভব করেন
  • বা আপনার ওজন দ্রুত বাড়ছে –

তাহলে একজন লিভার বিশেষজ্ঞ (গ্যাস্ট্রোএনটেরোলজিস্ট) এর পরামর্শ নিন।

উপসংহার

অনেকেই জানেন না ফ্যাটি লিভার কেন হয়, আর সেই অজ্ঞানতাই রোগটি নীরবে বাড়তে দেয়। ফ্যাটি লিভার আধুনিক জীবনের ‘নীরব শত্রু’। কিন্তু আশার কথা হচ্ছে, একটু সচেতনতা আর নিয়মমাফিক জীবনযাপনের মাধ্যমেই এই শত্রুকে হার মানানো যায়।

মনে রাখুন, লিভার আমাদের শরীরের “বডিগার্ড”। তাই এর যত্ন নেওয়া মানেই দীর্ঘ জীবন, সুস্থ জীবন।

আপনার খাবারই হতে পারে আপনার ওষুধ – আর সচেতনতা হতে পারে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ।

মূল তথ্যসারাংশ:

  • ফ্যাটি লিভার মানে লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমা
  • প্রধান কারণ: অনিয়মিত খাবার, ব্যায়ামের অভাব, স্থূলতা, ডায়াবেটিস
  • এটি নিরাময়যোগ্য – জীবনযাপনে পরিবর্তন আনলেই লিভার ভালো হয়ে যায়
  • ওজন কমানো, স্বাস্থ্যকর খাদ্য, ব্যায়াম, এবং স্ট্রেস কমানো সবচেয়ে কার্যকর উপায়
  • নির্দিষ্ট কিছু খাবার যেমন আখরোট, খেজুর, সবুজ চা ইত্যাদি লিভার সুস্থ রাখতে সাহায্য করে

 

তথ্যসূত্র

Staff writer. (2023). Steatotic (Fatty) Liver Disease. Cleveland Clinic. https://my.clevelandclinic.org/health/diseases/15831-fatty-liver-disease

Staff writer. (2024). Nonalcoholic Fatty Liver Disease. Johns Hopkins Medicine. https://www.hopkinsmedicine.org/health/conditions-and-diseases/nonalcoholic-fatty-liver-disease

Medicine Plus. (2025). Fatty Liver Disease. https://medlineplus.gov/fattyliverdisease.html

Staff writer. (2025). Non-alcoholic fatty liver disease (NAFLD). NHS. https://www.nhs.uk/conditions/non-alcoholic-fatty-liver-disease/

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here