নিপাহ ভাইরাস কীভাবে ছড়ায় তা জানা জরুরি। এটি কাঁচা খেজুরের রস, আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ এবং দূষিত ফলের মাধ্যমে দ্রুত মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হতে পারে।
নিপাহ ভাইরাস নামটা শুনলেই অনেকের মনে আতঙ্ক তৈরি হয়। তবে ভয় নয়, সচেতনতা আর সঠিক তথ্যই এই মারাত্মক ভাইরাস মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই নিপাহ ভাইরাসের খবর আসে, বিশেষ করে শীতের মৌসুমে। কাঁচা খেজুরের রস পান করা, অসতর্ক সামাজিক মেলামেশা এবং স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে এই ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই নিপাহ ভাইরাস কী, কীভাবে ছড়ায়, কীভাবে নিজেকে ও পরিবারকে নিরাপদ রাখা যায় এবং আক্রান্ত হলে কী করণীয়—এসব বিষয় পরিষ্কারভাবে জানা এখন সময়ের দাবি।
নিপাহ ভাইরাস কী?
নিপাহ ভাইরাস (Nipah Virus বা NiV) একটি মারাত্মক জুনোটিক ভাইরাস, অর্থাৎ এটি প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমিত হয়। এই ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৯৮–৯৯ সালে মালয়েশিয়ায়, পরে বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিকবার প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। নিপাহ ভাইরাস মানুষের মধ্যে তীব্র জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও মস্তিষ্কে প্রদাহ (Encephalitis) সৃষ্টি করতে পারে, যা অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) নিপাহ ভাইরাসকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ রোগজীবাণুর তালিকায় রেখেছে, কারণ –
- মৃত্যুহার অনেক বেশি (৪০–৭৫%)
- নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ বা টিকা নেই
- দ্রুত মানুষে মানুষে ছড়াতে পারে
বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাসকে বিশেষভাবে ভয়ংকর ধরা হয়, কারণ এখানকার সংক্রমণের ধরণ ও সামাজিক বাস্তবতা ভাইরাস ছড়ানোর অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
নিপাহ ভাইরাসের উৎস কোথায়?
নিপাহ ভাইরাসের প্রধান প্রাকৃতিক বাহক হলো ফলখেকো বাদুড়*(Fruit bat বা Flying fox)। এই বাদুড়গুলো সাধারণত খেজুর গাছের রস, ফল এবং গাছের আশপাশে চলাচল করে। তারা নিজেরা অসুস্থ না হলেও তাদের লালা, প্রস্রাব বা মল থেকে ভাইরাস ছড়াতে পারে।
বাদুড়ের সংস্পর্শ এড়াতে খেজুর গাছের রস সংগ্রহের জায়গায় প্রতিরক্ষামূলক আবরণ ব্যবহার করতে হবে।

নিপাহ ভাইরাস কীভাবে ছড়ায়?
নিপাহ ভাইরাস ছড়ানোর কয়েকটি প্রধান পথ রয়েছে:
১. কাঁচা খেজুরের রস পান করা
বাংলাদেশে নিপাহ সংক্রমণের সবচেয়ে বড় কারণ হলো কাঁচা খেজুরের রস। রাতের বেলা বাদুড় খেজুর গাছে বসে রস খায় এবং সেখানে লালা বা প্রস্রাব ফেলে। সকালে সেই রস সংগ্রহ করে পান করলে ভাইরাস শরীরে ঢুকে যায়।
২. আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা
নিপাহ ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারে, বিশেষ করে –
- আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি, হাঁচি
- লালা, থুতু, শ্বাস-প্রশ্বাসের ফোঁটা
- পরিচর্যার সময় সুরক্ষা না নিলে
৩. দূষিত ফল বা খাবার
বাদুড়ে কামড়ানো বা লালা লাগা ফল ভালোভাবে না ধুয়ে খেলে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে।
নিপাহ ভাইরাসের লক্ষণ কী কী?
নিপাহ ভাইরাসের লক্ষণ সাধারণত সংক্রমণের ৫–১৪ দিনের মধ্যে দেখা দেয়।
প্রাথমিক লক্ষণ
- হঠাৎ জ্বর
- মাথাব্যথা
- শরীর ব্যথা
- দুর্বলতা
- বমি বা বমিভাব
গুরুতর লক্ষণ
- শ্বাসকষ্ট
- অতিরিক্ত ঘুম ভাব বা অচেতনতা
- খিঁচুনি
- বিভ্রান্তি
- কথা বলতে বা চলাফেরা করতে সমস্যা
গুরুতর অবস্থায় রোগী দ্রুত কোমায় চলে যেতে পারে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
নিপাহ ভাইরাস থেকে বাঁচতে কী করতে হবে?
নিপাহ ভাইরাস প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় অস্ত্র। কিছু সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস এই ভাইরাস থেকে বাঁচাতে পারে।

১. কাঁচা খেজুরের রস এড়িয়ে চলুন
খেজুরের কাঁচা রস পান করবেন …
রস সংগ্রহের সময় গাছে বাঁশ বা জাল ব্যবহার করতে হবে।
২. ফল ভালোভাবে ধুয়ে খান
বিশেষ করে মাটিতে পড়ে থাকা ফল।
বাদুড়ে কামড়ানো ফল কখনোই খাবেন না।
৩. অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শে সতর্কতা
জ্বর বা শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত ব্যক্তির কাছাকাছি গেলে মাস্ক ব্যবহার কর…
রোগীর লালা বা থুতুর সংস্পর্শ এড়িয়ে চল।
পরিচর্যার সময় হাত ধোয়া বাধ্যতামূলক।
৪. হাত পরিষ্কার রাখুন
সাবান দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড হাত ধোয়ার অভ্যাস করুন।
বাইরে থেকে এসে, খাবার আগে ও পরে হাত ধোয়া জরুরি।
৫. গুজবে কান দেবেন না
নিপাহ নিয়ে ভুল তথ্য আতঙ্ক বাড়ায়।
কেবল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিশ্বস্ত সূত্রের তথ্য অনুসরণ কর…
নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে কী করবেন?
১. দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন
নিপাহ ভাইরাস সন্দেহ হলে দেরি না করে নিকটস্থ সরকারি বা বিশেষায়িত হাসপাতালে যান।
২. নিজেকে আলাদা রাখুন
পরিবারের অন্য সদস্যদের থেকে দূরে থাকুন।
আলাদা ঘর ও আলাদা বাসন ব্যবহার করুন।
৩. নিজে থেকে ওষুধ খাবেন না
নিপাহ ভাইরাসের নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। চিকিৎসা মূলত রোগ নিয়ন্ত্রণে সেবা, অর্থাৎ –
- জ্বর নিয়ন্ত্রণ
- শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখা
- খিঁচুনি বা জটিলতা সামলানো
৪. স্বাস্থ্যকর্মীদের সহযোগিতা করুন
আপনার সাম্প্রতিক খাবার, ভ্রমণ ও সংস্পর্শের তথ্য সঠিকভাবে দ…
কন্টাক্ট ট্রেসিংয়ে সাহায্য করুন।
নিপাহ ভাইরাস কেন এত ভয়ংকর?
নিপাহ ভাইরাস ভয়ংকর হওয়ার কারণ
- মৃত্যুহার বেশি
- দ্রুত অবস্থা খারাপ হয়
- কোনো টিকা নেই
- মানুষে মানুষে ছড়াতে পারে
তবে ভালো খবর হলো, সচেতনতা থাকলে এটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য।
উপসংহার
নিপাহ ভাইরাস নতুন কোনো রোগ নয়, কিন্তু আমাদের অসচেতনতা একে বারবার ভয়ংকর করে তোলে। নিপাহ ভাইরাস কীভাবে ছড়ায় সেটা জানা জরুরি। কাঁচা খেজুরের রস এড়িয়ে চলা, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই পারে অসংখ্য প্রাণ বাঁচাতে। আতঙ্ক নয় – জ্ঞান, সতর্কতা ও দায়িত্বশীল আচরণই নিপাহ ভাইরাস মোকাবিলার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।
তথ্যসূত্র
WHO writer. (2026) Nipah virus. World Health Organization. https://www.who.int/news-room/fact-sheets/detail/nipah-virus
Michal Ruprecht. (2026). What to know about the Nipah virus. CNN. https://edition.cnn.com/2026/01/29/health/nipah-virus-explainer
CDC writer. (2026). About Nipah Virus. CDC. https://www.cdc.gov/nipah-virus/about/index.html
Ayman Anika. (2026). Nipah virus explained: How it spreads and how Bangladesh can stay safe. The Daily Star. https://www.thedailystar.net/life-living/health-fitness/news/nipah-virus-explained-how-it-spreads-and-how-bangladesh-can-stay-safe-4093421








